পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (পঞ্চদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৯০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8१७ রবীন্দ্র-রচনাবলী জ্ঞান ও মহত্তর চেষ্টার দিকে অর্থাৎ ভূমার দিকে আকর্ষণ করে, যা মানুষকে বিনা কারণেই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে দুঃখকে স্বীকার করতে, সুখকে বিসর্জন করতে প্রবৃত্ত করে —তাতেই কেবল জানিয়ে দিতে থাকে, সুখে স্বার্থে মানুষের স্থিতি নেই– তার থেকে নিষ্ক্রাস্ত হবার জন্যে মানুষকে বন্ধনের পর বন্ধন ছেদন করতে হবে— মঙ্গলের সম্বন্ধে বিশ্বের সঙ্গে যোগযুক্ত হয়ে মানুষকে মুক্তিলাভ করতে হবে। এই স্বার্থের আবরণ থেকে নিষ্ক্রান্ত হওয়াই হচ্ছে স্বার্থ ও পরমার্থের সামঞ্জস্যসাধন । কারণ, স্বার্থের মধ্যে অাবৃত থাকলেই তাকে সত্যরূপে পাওয়া যায় না। স্বার্থ থেকে যখন আমরা বহির্গত হই, তখনি আমরা পরিপুর্ণরূপে স্বার্থকে লাভ করি। তখনি আমরা আপনাকে পাই বলেই অন্য-সমস্তকেই পাই । গর্ভের শিশু নিজেকে জানে না বলেই তার মাকে জানে না— যখনি মাতার মধ্য হতে মুক্ত হয়ে সে নিজেকে জানে, তখনি সে মাকে জানে । " * সেইজন্যে যতক্ষণ স্বার্থের নাড়ীর বন্ধন ছিন্ন করে মানুষ এই মঙ্গললোকের মধ্যে জন্মলাভ না করে, ততক্ষণ তার বেদনার অস্ত নেই। কারণ, যেখানে তার চরম স্থিতি নয়, যেখানে সে অসম্পূর্ণ, সেখানেই চিরদিন স্থিতির চেষ্টা করতে গেলেই তাকে কেবলি টানাটানির মধ্যে থাকতে হবে। সেখানে সে যা গড়ে তুলবে তা ভেঙে পড়বে, যা সংগ্রহ করবে তা হারাবে এবং যাকে সে সকলের চেয়ে লোভনীয় বলে কামনা করবে তাই তাকে আবদ্ধ করে ফেলবে । তখন কেবল আঘাত, কেবল আঘাত । তখন পিতার কাছে আমাদের কামনা এই– মা মা হিংসীঃ— আমাকে আঘাত কোরো না, আমাকে আর আঘাত কোরো না। আমি এমন করে কেবলি দ্বিধার মধ্যে আর বঁচি নে । কিন্তু এ পিতারই হাতের আঘাত— এ মঙ্গললোকের আকর্ষণেরই বেদন । নইলে পাপে দুঃখ থাকত না— পাপ বলেই কোনো পদার্থ থাকত না, মানুষ পশুদের মতো অপাপ হয়ে থাকত। কিন্তু, মানুষকে মানুষ হতে হবে বলেই এই দ্বন্দ্ব, এই বিদ্রোহ, বিরোধ, এই পাপ, এই পাপের বেদনা। তাই-জন্তে মানুষ ছাড়া এ প্রার্থনা কেউ কোনোদিন করতে পারে না— বিশ্বানি দেব সবিতরঙ্কুরিতানি পরাস্কব—হে দেব, হে পিতা, আমার সমস্ত পাপ দূর করে দাও। এ ক্ষুধামোচনের প্রার্থনা নয়, এ প্রয়োজনসাধনের প্রার্থনা নয়— মানুষের প্রার্থনা হচ্ছে, ‘আমাকে পাপ হতে মুক্ত করে । তা না করলে আমার দ্বিধা ঘুচবে না— পুর্ণতার মধ্যে আমি ভূমিষ্ঠ হতে পারছি নে—হে অপাপবিদ্ধ নির্মল পুরুষ, তুমিই যে আমার পিতা, এই বোধ আমার সম্পূর্ণ হতে পারছে না— তোমাকে সত্যভাবে নমস্কার করতে পারছি নে ?