পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (পঞ্চদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৫১৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


९०२ রবীন্দ্র-রচনাবলী ঐকাস্তিক জ্ঞানের সাধনা যেমন শুষ্ক বৈরাগ্য অনে, ঐকান্তিক রসের সাধনাও তেমনি ভাববিহবলতার বৈরাগ্য নিয়ে আসে। সে অবস্থায় কেবলই রসের নেশায় আবিষ্ট হয়ে থাকতে ইচ্ছা করে, আর-সমস্তের প্রতি একান্ত বিতৃষ্ণা জন্মে এবং কর্মের বন্ধনমাত্রকে অসহ্য বলে বোধ হয়। অর্থাৎ মনুষ্যত্বের কেবল একটিমাত্র দিক অত্যন্ত প্রবল হয়ে ওঠাতে অন্য সমস্ত দিক একেবারে রিক্ত হয়ে যায়, তখন আমরা ভগবানের উপাসনাকে কেবলই একটিমাত্র অংশে অত্যুগ্র করে তুলি, এবং অন্য-সকল দিক থেকেই তাকে শূন্ত করে রাখি । ভগবংলাভের জন্য একান্ত ব্যাকুলতা সত্ত্বেও এই-রকম সামঞ্জস্তচু্যত বৈরাগ্য মহর্ষির চিত্তকে কোনোদিন অধিকার করে নি। তিনি সংসারকে ত্যাগ করেন নি, সংসারের স্বরকে ভগবানের ভক্তিতে বেঁধে তুলেছিলেন। ঈশ্বরের দ্বারা সমস্তকেই আচ্ছন্ন করে দেখবে, উপনিষদের এই উপদেশবাক্য অনুসারে তিনি তার সংসারের বিচিত্র সম্বন্ধ ও বিচিত্র কর্মকে ঈশ্বরের দ্বারাই পরিব্যাপ্ত করে দেখবার তপস্যা করেছিলেন । কেবল নিজের পরিবার নয়, জনসমাজের মধ্যেও ব্রহ্মকে উপলব্ধি করবার সমস্ত বিন্ন দূর করতে তিনি চিরজীবন চেষ্টা করেছেন। এইজন্য এই শান্তিনিকেতনের বিশাল প্রান্তরের মধ্যেই হ’ক আর হিমালয়ের নিভৃত গিরিশিখরেই হ’ক, নির্জন সাধনায় তাকে বেঁধে রাখতে পারে নি। তার ব্রহ্ম একলার ব্রহ্ম নয়— তার ব্রহ্ম শুধু জ্ঞানীর ব্ৰহ্ম নয়, শুধু ভক্তের ব্রহ্মও নয়, তার ব্রহ্ম নিখিলের ব্রহ্ম ; নির্জনে তার ধ্যান, সজনে র্তার সেবা ; অস্তরে তার স্মরণ, বাহিরে তার অমুসরণ ; জ্ঞানের দ্বারা তার তত্ত্ব-উপলব্ধি, হৃদয়ের দ্বারা তার প্রতি প্রেম, চরিত্রের দ্বারা তার প্রতি নিষ্ঠা এবং কর্মের দ্বারা তার প্রতি আত্মনিবেদন । এই যে পরিপূর্ণস্বরূপ ব্রহ্ম, সর্বাঙ্গীণ মনুষ্যত্বের পরিপূর্ণ উৎকর্ষের স্বারাই আমরা র্যার সঙ্গে যুক্ত হতে পারি— তার যথার্থ সাধনাই হচ্ছে র্তার যোগে সকলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং সকলের যোগে তারই সঙ্গে যুক্ত হওয়া— দেহ মন হৃদয়ের সমস্ত শক্তি দ্বারাই তাকে উপলব্ধি করা এবং তার উপলব্ধির দ্বারা দেহমনহৃদয়ের সমস্ত শক্তিকে বলশালী করা— অর্থাৎ পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যের পথকে গ্রহণ করা। মহর্ষি তার ব্যাকুলতার দ্বারা এই সম্পূর্ণতাকেই চেয়েছিলেন এবং তার জীবনের দ্বার একেই নির্দেশ করেছিলেন । ব্রহ্মের উপাসনা কাকে বলে সে সম্বন্ধে তিনি বলেছেন, তস্মিন প্রতিস্তস্য প্রিয়কার্যসাধনঞ্চ তদুপাসনমেব— তাতে প্রীতি করা এবং তার প্রিয়কার্য সাধন করাই তার উপাসনা। এ-কথা মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশে ইতিপূর্বে তার প্রতি প্রীতি এবং উার প্রিয়কাৰ্য-সাধন, এই উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে গিয়েছিল । অন্তত