পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (পঞ্চদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৫২৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন & SS সেই বড়ো কথাটিকে আজ আমাদের হৃদয়মনের মধ্যে আমাদের জীবনের সমস্ত সংকল্পের মধ্যে পরিপূর্ণ করে নেব । সকলের সঙ্গে আমাদের এই যোগের সংগীতটি আজ কে বাজাবেন । সেই মহাযোগী, জগতের অসংখ্য বীণাতন্ত্রী র্যার কোলের উপরে অনন্তকাল ধরে স্পন্দিত হচ্ছে । তিনিই একের সঙ্গে অন্যের, অস্তরের সঙ্গে বাহিরের, জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর, আলোর সঙ্গে অন্ধকারের, যুগের সঙ্গে যুগান্তরের, বিচ্ছেদ ঘটিয়ে ঘটিয়ে মিলন ঘটিয়ে তুলছেন ; তারই হাতের সেই বিচ্ছেদমিলনের ঝংকারে বৈচিত্র্যের শত শত তান কেবলই উৎসারিত হয়ে আকাশ পরিপূর্ণ করে ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ; একই ধুয়ে থেকে তানের পর তান ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে, এবং একই ধুয়োতে তানের পর তান এসে পরিসমাপ্ত হচ্ছে । বীণার তারগুলো যখন বাজে না তখন তারা পাশাপাশি পড়ে থাকে, তবুও তাদের মিলন হয় না, তখনো তারা কেউ কাউকে আপন বলে জানে না । যেই বেজে ওঠে অমনি স্বরে স্বরে তানে তানে তাদের মিলিয়ে দেয়— তাদের সমস্ত ফাকগুলো রাগরাগিণীর মাধুর্যে ভরে ভরে ওঠে। তখন তারা স্বতন্ত্র তবু এক,– কেউ-বা লোহার কেউ-বা পিতলের, তৰু এক,— কেউ-বা সরু স্বরের কেউ-বা মোট স্বরের, তৰু এক— তখন তারা কেউ কাউকে আর ছাড়তে পারে না । তাদের প্রত্যেকের ভিতরের সত্য বাণীটি যেই প্রকাশ হয়ে পড়ে অমনি সত্যের সঙ্গে সত্যের, প্রকাশের সঙ্গে প্রকাশের অন্তরতর মিলটি সৌন্দর্যের উচ্ছ্বাসে ধরা পড়ে যায়— দেখা যায় আপনার মধ্যে স্বর যতই স্বতন্ত্ৰ হ’ক, গানের মধ্যে তারা এক । আমাদের জীবনের বীণাতে, সংসারের বীণাতে প্রতিদিন তার বাধা চলছে, স্বর বাধা এগোচ্ছে। সেই বঁাধবার মুখে কত কঠিন আঘাত, কত তীব্র বেসুর। তখন চেষ্টার মুতি, কষ্টের মুর্তিটাই বারবার করে দেখা যায়। সেই বেস্থরকে সমগ্রের সুরে মিলিয়ে তুলতে এত টান পড়ে যে, এক একসময় মনে হয় যেন তার আর সইতে পারল না, গেল বুঝি ছিড়ে । i এমনি করে চেয়ে দেখতে দেখতে শেষকালে মনে হয়, তবে বুঝি সার্থকতা কোথাও নেই– কেবলই বুঝি এই টানাটানি বাধাবাধি, দিনের পর দিন কেবলই খেটে মরা, কেবলই ওঠা পড়া, কেবলই অহংযন্ত্রটার অচল খোটার মধ্যে বাধা থেকে মোচড় খাওয়া —কোনো অর্থ নেই, কোনো পরিণাম নেই– কেবলই দিনযাপন মাত্র। কিন্তু যিনি আমাদের বাজিয়ে, তিনি কেবলই কি কঠিন হাতে নিয়মের খোটায় চড়িয়ে পাক দিয়ে দিয়ে আমাদের স্বরই বাধছেন। তা তো নয়। সঙ্গে-সঙ্গে মুহূর্তে