পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ষোড়শ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩১৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ ৩১১ দেখিল রৌদ্র উঠিয়াছে। ভয়ে মন্দির ছাড়িয়া মাঠে বাহির হইয়া পড়িল । সেখানেও কে ডাকিল, ‘বাবা।” যজ্ঞনাথ সচকিত হইয়া পিছন ফিরিয়া দেখিলেন, বৃন্দাবন । বৃন্দাবন কহিল, ‘বাবা, সন্ধান পাইলাম আমার ছেলে তোমার ঘরে লুকাইয়া আছে, তাহাকে দাও।” বৃদ্ধ চোখ মুখ বিকৃত করিয়া বৃন্দাবনের উপর ঝুকিয়া পড়িয়া বলিল, “তোর ছেলে ? বৃন্দাবন কহিল, ‘হঁ৷ গোকুল— এখন তাহার নাম নিতাই পাল, আমার নাম দামোদর। কাছাকাছি সর্বত্রই তোমার খ্যাতি আছে, সেইজন্য আমরা লজ্জায় নাম পরিবর্তন করিয়াছি, নহিলে কেহ আমাদের নাম উচ্চারণ করিত না ।” বৃদ্ধ দশ অঙ্গুলি দ্বারা আকাশ হাংড়াইতে হাংড়াইতে যেন বাতাম আঁকড়িয়া ধরিবার চেষ্টা করিয়া ভূতলে পড়িয়া গেল । চেতনা লাভ করিয়া যজ্ঞনাথ বৃন্দাবনকে মন্দিরে টানিয়া লইয়া গেল । কহিল, ‘কান্না শুনিতে পাইতেছ ? বৃন্দাবন কহিল, না।’ ‘কান পাতিয়া শোনো দেখি বাবা বলিয়া কেহ ডাকিতেছে ? বৃন্দাবন কহিল, না।’ বৃদ্ধ তখন যেন ভারী নিশ্চিন্ত হইল । তাহার পর হইতে বৃদ্ধ সকলকে জিজ্ঞাসা করিয়া বেড়ায়, ‘কান্না শুনিতে পাইতেছে ? পাগলামির কথা শুনিয়া সকলেই হাসে । *g অবশেষে বৎসর চারেক পরে বৃদ্ধের মৃত্যুর দিন উপস্থিত হইল। যখন চোখের উপর হইতে জগতের আলো নিবিয়া আসিল এবং শ্বাস রুদ্ধপ্রায় হইল তখন বিকারের বেগে সহসা উঠিয়া বসিল ; একবার দুই হস্তে চারি দিক হাংড়াইয়া মুমূর্ষু কহিল, ‘নিতাই, আমার মইটা কে উঠিয়ে নিলে।’ সেই বায়ুহীন আলোকহীন মহাগহবর হইতে উঠিবার মই খুজিয়া না পাইয়৷ আবার সে ধুপ, করিয়া বিছানায় পড়িয়া গেল। সংসারের লুকোচুরি খেলায় যেখানে কাহাকেও খুজিয়া পাওয়া যায় না সেইখানে অন্তৰ্হিত হইল । t পৌষ ১২৯৮