পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ষোড়শ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩২৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ ●>> আমিন দালিয়াকে আর একটু সচেতন করিয়া তুলিবার জন্য কহিল, রাজাকে মারিয়া আর কি আ ম ফিরিব।” 感 দালিয়া কথাটা সংগত জ্ঞান করিয়া কহিল, ‘ফেরা কঠিন বটে । আমিনার সমস্ত অন্তরাত্মা একেবারে স্নান হইয়া গেল। জুলিখার দিকে ফিরিয়া নিশ্বাস ফেলিয়া কহিল, ‘দিদি, আমি প্রস্তুত আছি।” এবং দালিয়ার দিকে ফিরিয়া বিদ্ধ অন্তরে পরিহাসের ভান করিয়া কহিল, রানী হইয়াই আমি প্রথমে তোমাকে রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে যোগ দেওয়া অপরাধে শাস্তি দিব। তার পরে আর যাহা করিতে হয় করিব।” শুনিয়া দালিয়া বিশেষ কৌতুক বোধ করিল, যেন প্রস্তাবটা কার্যে পরিণত হইলে তাহার মধ্যে অনেকটা আমোদের বিষয় আছে । ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ অশ্বারোহী পদাতিক নিশান হস্তী বাদ্য এবং আলোকে ধীবরের ঘর-দুয়ার ভাঙিয়া পড়িবার জো হইল। রাজপ্রাসাদ হইতে স্বর্ণমণ্ডিত দুই শিবিকা আসিয়াছে। আমিন জুলিখার হাত হইতে ছুরিখানি লইল । তাহার হস্তিদন্তনির্মিত কারুকার্য অনেক ক্ষণ ধরিয়া দেখিল । তাহার পর বসন উদঘাটন করিয়া নিজের বক্ষের উপর একবার ধার পরীক্ষা করিয়া দেখিল। জীবনমুকুলের বৃন্তের কাছে ছুরিটি একবার স্পর্শ করিল, আবার সেটি খাপের মধ্যে পুরিয়া বসনের মধ্যে লুকাইয়া রাখিল । একান্ত ইচ্ছা ছিল, এই মরণযাত্রার পূর্বে একবার দালিয়ার সহিত দেখা হয়, কিন্তু কাল হইতে সে নিরুদ্দেশ। দালিয়া সেই-যে হাসিতেছিল তাহার ভিতরে কি-অভি মানের জালা প্রচ্ছন্ন ছিল । d kan শিবিকায় উঠিবার পূর্বে আমিন তাহার বাল্যকালের আশ্রয়টি অশ্রজলের ভিতর হইতে একবার দেখিল— তাহার সেই ঘরের গাছ, তাহার সেই ঘরের নদী। ধীবরের হাত ধরিয়া বাষ্পরুদ্ধ কম্পিত স্বরে কহিল,বুঢ়া,তবে চলিলাম। তিন্নি গেলে তোর ঘরকন্ন কে দেখিবে ’ বুঢ়া একেবারে বালকের মতে কাদিয়া উঠিল। আমিনা কহিল বুঢ়া, যদি দালিয়া আর এখানে আসে তাহাকে এই আঙটি দিয়ে । বলিয়ে, তিন্নি যাইবার সময় দিয়া গেছে।’ এই বলিয়াই দ্রুত শিবিকায় উঠিয়া পড়িল। মহাসমারোহে শিবিক চলিয়া গেল । আমিনার কুটির, নদীতীর, কৈলুতরুতল অন্ধকার, নিস্তব্ধ, জনশূন্ত হইয়া গেল।