পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ষোড়শ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৭২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


sss রবীন্দ্র-রচনাবলী জীর্ণ দেয়ালে ভাঙা-ঘড়ির কাটার মতো চিরদিনের জন্য থেমে গেছে ? গৌরব করে বলব আমাদেরই দেশে সচল সত্য অচল পাথর হয়ে গেছে— বুকের উপরে সেই জগদল পাথরের ভার আমরা বইছি’ ? না, কখনোই না। উদবোধনের মন্ত্র আজ জগৎ জুড়ে বাজছে; যাত্রী, বেরিয়ে এসো, বেরিয়ে এসো। ভেঙে ফেলো তোমার নিজের হাতের রচিত কারাগার । সেই যাত্রীদের সঙ্গে চলে যারা চন্দ্র-সূর্য-তারার সঙ্গে এক তালে পা ফেলে ফেলে চলছে। ১১ মাঘ ১৩২১, সন্ধ্যার উদবোধন মাধুর্যের পরিচয় আমাদের মন্ত্রে আছে ; পিতা নোহসি পিতা নো বোধি । তুমি আমাদের পিতা, তুমি পিতা আমাদের এই বোধ দাও। এই পিতার বোধ আমাদের অন্তকরণে সজাগ নেই বলে আমাদের যেমনই ক্ষতি হোক, পিতার সঙ্গে আমাদের সম্বন্ধের দিক দিয়ে তার কাজ সমানই চলেছে। আমাদের বোধের অসম্পূর্ণতাতে তার কোনো ব্যাঘাত হয় নি। তিনি তার সমস্ত সস্তানের মধ্যে চৈতন্য ও প্রাণ প্রেরণ করেছেন, র্তার পিতৃত্ব মানবসমাজে কাজ করেই চলেছে। কিন্তু, এক জায়গায় তিনি সুপ্ত হয়ে আছেন ; তিনি যেখানে আমাদের প্রিয়তম সেখানে তিনি জাগেন নি। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার প্রেম উদবোধিত হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আত্মার গভীর অন্ধকার নির্জনতার মধ্যে সেই প্রিয়তম স্বপ্ত হয়ে আছেন। সংসারের সকল রসের ভিতরে যে তার রস, সকল মাধুর্য সকল প্রতির মূলে যে তার প্রতি— এ কথা আমি জানলুম না। আমার প্রেম জাগল না। অথচ তিনি যে সত্যই প্রিয়তম এ কথা সত্য। এ বললে স্বতোবিরুদ্ধতা দোষ ঘটে ? কারণ, তিনি যদি প্রিয়তম তবে তাকে ভালোবাসি না কেন । কিন্তু, তা বললে কী হবে, তিনি আমার প্রিয়তম না হলে এত বেদন আমি পাব কেন । কত মানুষের ভিতরে জীবনের তৃপ্তির সন্ধান করা গেল, ধনমানের পিছনে পিছনে মরীচিকার সন্ধানে ফেরা গেল ; মন ভরল না, সে কেঁদে বলল, ‘জীবন ব্যর্থ হল— এমন একটি এককে পেলুম না যার কাছে সমস্ত প্রীতিকে নিঃশেষে নিবেদন করে দিতে পারি, দ্বিধা-সংশয়ের হাত থেকে একেবারে নিষ্কৃতি পেতে পারি। ক্ষণে ক্ষণে এ মানুষকে ও মানুষকে আশ্রয় করলুম ; কিন্তু, জীবনের সেই-সব প্রেমের বিচ্ছিন্ন মুহূর্তগুলিকে ভরে তুলবে কেমন করে। কোন মাধুর্যের প্লাবনে ছেদগুলো সব ভরে যাবে। এমন একের কাছে আপনাকে নিবেদন করি নি বলেই এত বেদন পাচ্ছি।