পাতা:রাশিয়ার চিঠি-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১৩৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

 একদিন আমাদের দেশে পল্লীসমাজ সজীব ছিল। এই সমাজের ভিতর দিয়েই ছিল সমস্ত দেশের যােগবন্ধন, আমাদের সমস্ত শিক্ষাদীক্ষা ধর্মকর্মের প্রবাহ পল্লীতে পল্লীতে ছিল সঞ্চারিত। দেশের বিরাট চিত্ত পীতে পল্লীতে প্রসারিত হয়ে আশ্রয় পেয়েছে, প্রাণ পেয়েছে। এ-কথা সত্য যে, আধুনিক অনেক জ্ঞানবিজ্ঞান সুযােগসুবিধা থেকে আমরা বঞ্চিত ছিলুম। তখন আমাদের চেষ্টার পরিধি ছিল সংকীর্ণ, বৈচিত্র্য ছিল স্বল্প, জীবনযাত্রার আয়ােজনে উপকরণে অভাব ছিল বিস্তর। কিন্তু সামাজিক প্রাণক্রিয়ার যােগ ছিল অবিচ্ছিন্ন। এখন তা নেই। নদীতে স্রোত যখন বহমান থাকে তখন সেই স্রোতের দ্বারাই এপারে ওপারে এদেশে ওদেশে অনাগােনা-দেনাপাওনার যােগ রক্ষা হয়। জল যখন শুকিয়ে যায় তখন এই নদীরই খাতু বিষম বিন্ন হয়ে ওঠে। তখন এক কালের পথটাই হয় অন্য কালের অপথ। বর্তমানে তাই ঘটেছে।

 যাদের আমরা ভদ্রসাধারণ নাম দিয়ে থাকি তারা যে বিদ্যালাভ করে, তাদের যা আকাঙ্ক্ষা ও সাধনা, তারা যে-সব সুযােগসুবিধা ভােগ করে থাকে সে-সব হল মরা নদীর শুষ্ক গহ্বরের এক পাড়িতে তার অপর পাড়ির সঙ্গে জ্ঞানবিশ্বাস আচার-অভ্যাস দৈনিক জীবনযাত্রায় দুস্তর দূরত্ব। গ্রামের লােকের না আছে বিদ্যা, না আছে আরােগ্য, না আছে সম্পদ, না আছে অন্নবস্ত্র। ওদিকে যারা কলেজে পড়ে, ওকালতি করে, ডাক্তারি করে, ব্যাঙ্কে টাকা জমা দেয়, তারা রয়েছে দ্বীপের মধ্যে; চারিদিকে অতলস্পর্শ বিচ্ছেদ।

 যে-স্নায়ুজালের যােগে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বেদনা দেহের মর্মস্থানে পৌছয়, সমস্ত দেহের আত্মবােধ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বােধের সম্মিলনে সম্পূর্ণ হয়, তার

১২৭