তাহাকে উপরের বারান্দার মাদুর পাতিয়া পিসিমার সুমুখে বসিয়া পড়া করিতে হইবে না; কেন না, মুখস্থ করিবার মত সংসারে তাহার আর কিছুই বাকী নাই। কিন্তু যেদিন দেখিল ও-পাড়ার পাঠশালার অবিনাশ পণ্ডিত তাহাদের বাড়ী আনাগোনা করিতে আরম্ভ করিয়াছেন, সেদিন তাহার ভুল ভাঙ্গিল। যাহা হউক, পরে পাঠশালায় ভর্ত্তি হইয়া প্রথমপ্রথম সে সব ছেলের অপেক্ষা ভাল পড়া বলিতে পারিত বলিয়া বৃদ্ধ গুরুমহাশয় প্রায়ই বাড়ী ফিরিবার পথে একটু কষ্ট স্বীকার করিয়া গোকুলের পিসিমার ‘কাছ’ হইয়া যাইতেন। তাঁহার মুখে গোকুলের প্রশংসা শুনিয়া-শুনিয়া নারায়ণীর আনন্দ-চঞ্চল চিত্ত বার-বার বলিয়া উঠিত যে, আরও ত কত লোকের কত ছেলে রহিয়াছে, কিন্তু কৈ, তাঁহার গোকুলের মত পড়া বলিতে আর ত কেউ পারে না!
সংসারে অত্যধিক গর্ব্বেরও যে পরিতাপ আছে, জানিনা বিধবা কেন তাহা বিস্মৃত হইয়াছিলেন। কেন না, আর একটা বৎসর যাইতে না যাইতেই, অর্থাৎ গোকুল শত্রুর মুখে ছাই দিরা আপদ্ বালাইয়ের হস্ত হইতে রক্ষা পাইয়া দশ পার হইয়া এগার বৎসরে পা দিয়াই পিতৃহীন হইল।
এই সময়, দাদা মরিলেন সে জন্য ত বটেই, তা ছাড়া আরও একটী বিশেষ কারণের জন্য নারায়ণীর মাথার উপর যেন বজ্রাঘাত হইল। কারণটী, ছেলের পড়াশুনার একটা সুবন্দোবস্ত করিয়া দেওয়া। অবিনাশ পণ্ডিতের পাঠশালায় ছেলের আর অধিক শিক্ষালাভের সম্ভাবনা না থাকায় এবং বক্নাহাটী হইতে দু’তিনখানি গ্রামের মধ্যেও অন্য কোন ভাল স্কুল না থাকার নারায়ণী কিছু দিন হইতে চিন্তিত হইয়া পড়িয়াছিলেন।