বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:লালন-গীতিকা.djvu/১০

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৷৵৹
লালন-গীতিকা

সন্তানহীন মুসলমান দম্পতির নিকট আশ্রয় লাভ করিয়া নিরাময় হইয়া উঠিয়াছিলেন।

 মুসলমানের গৃহে লালিত-পালিত হইয়া লালন সিরাজ সাঁই নামক একটি মুসলমান ফকিরের নিকট হইতে দীক্ষা গ্রহণ করেন। মনসুরউদ্দীন সাহেবের মতে সিরাজ সাঁই ছিলেন নদীয়া জেলার হরিনারায়ণপুর গ্রামের একজন পাল্কীবাহক। কাহারও মতে সিরাজ সাঁই ফরিদপুর জেলার কালুখালি স্টেশনের নিকটবর্তী কোনও গ্রামের অধিবাসী। অপর মতে সিরাজ সাঁই ছিলেন যশোহর জিলার ঝিনাইদহ মহকুমার অন্তর্গত হরিশপুর গ্রামের অধিবাসী। যেখানেই বাড়ি থাক, সিরাজ সাঁই সম্ভবতঃ ফকিরধর্ম গ্রহণ করিয়া বাঙলার বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরিয়া বেড়াইতেন, লালন ফকিরও সম্ভবতঃ গুরুর সঙ্গে সঙ্গে বাঙলার বহু অঞ্চলে ঘুরিয়া বেড়াইয়াছেন।

 কয়েক বৎসর গুরু সিরাজ সাঁইর সহিত ঘুরিয়া লালন বাড়ি ফিরিয়া আসেন। তীর্থযাত্রী সঙ্গীরা রটাইয়া দিয়াছিল, লালনের মৃত্যু হইয়াছে; লালনের মা ও স্ত্রী তাহাই জানিত। লালন বাড়ি ফিরিয়া তাঁহার রোগারোগ্যের সংবাদ এবং মুসলমানের গৃহে লালিত-পালিত হইবার বৃত্তান্ত জানাইলে মা আর তাঁহাকে ঘরে ফিরাইয়া লইতে রাজি হইলেন না,—স্ত্রীও তাহার সঙ্গিনী হইতে অস্বীকার করিল। লালন তখন সংসারের মায়া সম্পূর্ণ কাটাইয়া পুনরায় গুরু সিরাজ সাঁইয়ের সঙ্গে মিলিত হইলেন। সম্ভবতঃ সিরাজ সাঁইয়ের মৃত্যুর পরে লালন কুষ্ঠিয়ার গোরাই নদীর ধারে সেঁউড়িয়া গ্রামে আসিয়া আস্তানা করেন—সেইখানেই আস্তে আস্তে তাঁহার আখড়া গড়িয়া উঠিল। লালন এই আখড়াতেই স্থায়িভাবে বাস করিতেন না, বাঙলাদেশের দূর দূর অঞ্চলে তাঁহার বহু শিষ্য ছিল—তিনি এইসব অঞ্চলে ঘুরিয়া বেড়াইতেন ও নিজের সাধন-ভজনের প্রচার করিতেন। এখনো পর্যন্ত বাঙলার বাউল সম্প্রদায়ের মধ্যে লালন ফকিরের যেরূপ প্রতিষ্ঠা তাহাতে মনে হয় বহু অঞ্চল জুড়িয়া তাঁহার শিষ্য-সেবক ছিল।