শঙ্করদেব মালা-হস্তে ভক্তেরা কৃষ্ণনাম করিতে করিতে পথে বাহির হইলেই অনেকে দল বন্ধ হইয়া তাহাদিগকে বিদ্রূপ করিতে লাগিলেন । তাহাদিগকে দেখিয়া । দূর হইতেই বলিতে লাগিলেন; “অরে! ভকতিয়া, এ দিকে আসিস্ না— আসিস্ না ! আমা দিগের এই-টুকু পথ অপবিত্র করিম্ না!” কেহ বা জপের মালা কাড়িয়া লইয়া কুকুরের লেজে বাঁধিয়া দিলেন! ভক্তেরা স্বল্পসংখ্যক, নীরবে এই সকল উপদ্রব সহিতে লাগিলেন ৷ ক্রমে এই সকল কথা শঙ্করদেবের কর্ণগোচর হইল ৷ তিনি প্রতিজ্ঞা করিলেন, পর দিবস বুড়া খাঁর গৃহে প্রকাশ্য সভায় বিরুদ্ধ-বাদীদের দমন করিয়া ভক্তিধর্ম্মের শ্রেষ্ঠত্ব স্থাপন করিবেন। এইরূপে নিৰ্জ্জন গৃহকোণ হইতে বহির্গত হইয়া শঙ্করদেব প্রচার-ক্ষেত্রে দণ্ডায়মান হইলেন । মাধবদেবের পিতা দীঘল পুরিয়া গিরির সহিত কেতাই খাঁ নামক তাঁহার যে জ্ঞাতি আসামে আসিয়া উপনিবিষ্ট হন, উপরোক্ত বুঢ়া খাঁ তাঁহারই পিতা । কেতাই খাঁ সম্পর্কে শঙ্করদেবের পিসা বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছেন । ইনিই তৎকালে গাঙ্গ মৌ ( ২৪ ) অঞ্চলের 'ভুক্রা' পদে আসীন ছিলেন। ইহার পিতৃশ্রাদ্ধ উপলক্ষে সমস্ত সমাজের নিমন্ত্রণ হইয়াছে। এই শ্রাদ্ধবাসরে উপস্থিত হইয়াই শঙ্করদেব সমগ্র পণ্ডিতমণ্ডলীকে বিচারে পরাস্ত করিয়া ভক্তিধর্ম্মের শ্রেষ্ঠত্ব স্থাপন করিবেন বলিয়া কল্য প্রকাশ করিয়াছেন। সমস্ত ভক্তগণ মালা হাতে সভায় যাইবার জন্য সজ্জিত হইয়া রহিয়াছেন । তখন শঙ্করদেব ভাবিতেছেন, “কল্য ক্রোধবশে যে কঠোর প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, তাহা ভাল হয় নাই । এই ভারতভূমিতে বেদবিধি ও ধর্ম্ম ব্রাহ্মণই রক্ষা করিয়া আসিয়াছেন । তাঁহাদের মধ্যে অনেক অব্রাহ্মণ আছেন বটে, কিন্তু ইঁহাদিগকে এই প্রকার প্রকাশ্যে অপমান করিলে সমগ্র ব্রাহ্মণকুলের অবমাননা হইবে। ভাল, আমি ব্রাহ্মণদিগের মুখেই হরিনাম ব্যক্ত করিব।” মনে মনে এইরূপ বিতর্ক করিয়া তিনি রামরাম গুরু, মাধব ও রামদাস ইত্যাদি ভক্তগণ সহ বুঢ়া খাঁর গৃহে উপস্থিত হইলেন । উপস্থিত পণ্ডিতদিগের মধ্যে রত্নাকর কন্দলী কিছু লঘুহৃদয় ছিলেন। ইনিই পূর্ব্বে পরামর্শ দিয়াছিলেন যে, নিন্দাবাদ দ্বারা ভক্তদিগকে নিরস্ত করিতে হইবে । শঙ্করদেব সভাস্থ হইয়া ইঁহার সন্নিহিত হইলেন এবং সবিনয়ে কহিলেন, “গুরো ! আপনাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি, বিবেচনা করিয়া আমাকে একটা ব্যবস্থা দিন।” শঙ্করের বিনয়পুর্ণ জিজ্ঞাসায় কন্দলী মনে মনে বিশেষ পরিতুষ্ট হইয়া তাঁহার ( ২৪ ) গাঙ্গ মৌ ব্রহ্মপুত্রের উত্তর পাবে আধুনিক দরঙ্গ জিলার অন্তবর্ত্তী।
পাতা:শঙ্করদেব - উমেশচন্দ্র দেব (১৯২০).pdf/৩৩
অবয়ব