পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (একাদশ সম্ভার).djvu/৩০৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ প্রতীক্ষা করিতেছে। কিন্তু সরোজিনী তাহাকে কোন ভরসাই দিল না, শুধু নীরবে চাহিয়া রহিল । আজ তা হলে আসি দিদিমণি, বলিয়া বেহারী উঠিয়া আসিয়া পায়ের কাছে গড় হইয়া প্রণাম করিল এবং পুনরায় পদধূলি গ্রহণ করিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। কিন্তু পরক্ষণেই অকস্মাৎ ফিরিয়৷ আসিয়া হাতজোড় করিয়া সম্মুখে দাড়াইল । কি বেহারী ? একটা কথা নিবেদন করব দিদিমণি ? সরোজিনী অনেক কষ্টে একটুখানি মান ই{{স টানিয়া আনিয়া কহিল, ক কথা ? 'বেহার তেমনি যুক্ত করে করুণকণ্ঠে কহিল, আমি গোয়ালা চাধা, তাতে বুড়েমাগুধ কি বলতে, য, কি বলে ফেলি, অপরাধ নেবেন না ? সরোজিনীর চোখ ফাটিয়। জল আসিয়া পড়িল । কিন্তু প্রাণপণে তাহা নিরোধ করিয়া ঘাড় নাড়িয়া শুধু বলিল, না । তাহার মুখের এই একটিমাত্র 'ন' শব্দ শুনিয়াই বেহাল্পীর যেন চমক ভাঙ্গিয়া গেল। সে নিজেকে চাষা প্রভৃতি বলিয়া নিজের বুদ্ধিহীনতার সহস্র পরিচয় দিলেও সে আসলে নিৰ্ব্বোধ ছিল না । স্বতরাং কেন যে সরোজিনী সাবিত্রীর কথা জিজ্ঞাসা করিতে তাহাকে পথ হইতে ডাকিয়া আনিয়াছিল, কেন যে সে এমন গভীর মনোনবেশপূর্বক তাহার কাহিনী শুনিতেছিল, সমস্ত ব্যাপারটা তাহার কাছে অকস্মাৎ স্থধ্যের আলোর মত নিৰ্ম্মল হইয়া উঠিল । এবং না জানিয়া সে যে তরুণীকে এতক্ষণ ধরিয়া বধিয়া এত বেদনা দিয়াছে, সেজন্ত তাহার মনস্তাপের অবধি রহিল না। তখন বেহারী নিরাতশয় করুণকণ্ঠে কহিল, আমি জানি তোমার কথা কখনো ঠেলতে পারবেন না–তুমিও ইচ্ছে করলে বাবুকে অসময়ে রক্ষে করতে পার । কিন্তু আমার মন বলে, তুমি যেন তাকে ত্যাগ করেচ মা । বেহারী এই প্রথম সরোজিনীকে মাতৃ সম্বোধন করিল। 'মা' বলিয়া কাজ আদায় করিবার ফন্দিটা বুড়া বেশ জানিত । সরোজিনীর অশ্র আর মানা মানিল না, দুই চক্ষু প্লাবিয়া বড় বড় ফোটা ঝর ঝর করিয়া বুড়ার সাক্ষাতেই ঝরিয়া পড়িল। কিন্তু তাড়াতাড়ি মুছিয়া ফেলিয়া কহিল, ন। বেহারী, আমার দ্বারা কিছু হবে না—আমি আর তার কথায় নেই। বেহারী ঘাড় নাড়িয়া কহিল, মা বলে ডেকেচি, আমি তোমার ছেলের মত। দোষ-ঘাট উার যাই হয়ে থাক, আমি ঘাট মানচি, বলিয়া বেহারী ঝুঁকিয়া পড়িয়া সরোজনীর পায়ের ধুলো মাথায় লইয়া বলিল, কিন্তু তুমি ত আমার বাবুকে চেনে ? ২৯৬