পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (চতুর্থ সম্ভার).djvu/৪২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ নদীর তীরে একখণ্ড পরিষ্কৃত গোময়লিপ্ত ঈষদুষ্ট ভূমির উপরে বসিয়া গহর এবং আর এক ব্যক্তি—আন্দাজ করিলাম, ইনিই বৈরাগী দ্বারিকাদ্বাস-আখড়ার বর্তমান অধিকারী । নদীর তীর বলিয়া তখনও সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ়তর হয় নাই, বাবাঙ্গীকে বেশ স্পষ্টই দেখিতে পাইলাম। লোকটিকে ভদ্র ও উচ্চ জাতির বলিয়াই মনে হুইল । বর্ণ খাম, রোগ বলিয়া কিছু দীর্ঘকায় বলিয়া চোখে ঠেকে ; মাথার চুল চুড়ার মত করিয়া স্বযুখে বাধা, দাড়ি-গোফ প্রচুর নয়—সামান্তই, চোখে-মুখে একটা স্বাভাবিক হাসির ভাব আছে, বয়সটা ঠিক আন্দাজ করিতে পারিলাম না, তবে পয়ত্রিশ-ছত্রিশের বেশী হইবে বলিয়া বোধ করিলাম না । আমার আগমন বা উপস্থিতি উভয়ের কেহই লক্ষ্য করিল না, দু’জনেই নদীর পরপারে পশ্চিম-দিগন্তে চাহিয়া স্তব্ধ হইয়া আছে । সেখানে নানা রঙ ও নানা আকারের টুকরো মেঘের মাঝে ক্ষীণ পাণ্ডুর তৃতীয়ার চাদ এবং ঠিক যেন তাহারই কপালের মাঝখানে ফুটিয়া আছে অত্যুজ্জল সন্ধ্যাতারা । বহু নিম্নে দেখা যায় দূর গ্রামাস্তের নীল বৃক্ষরাজি—তাহার যেন কোথাও আর শেষ নাই, সীমা নাই। কালো, সাদা, পাশুটে নানা বর্ণের ছেড়াখোড়া মেঘের গায়ে তখনও অস্তগত স্বর্ষ্যের শেষ দীপ্তি খেলিয়া বেড়াইতেছে—ঠিক যেন দুষ্ট ছেলের হাতে রঙের তুলি পড়িয়া ছবির আদ্যশ্ৰাদ্ধ চলিতেছে । তাহার ক্ষণকালের আনন্দ -চিত্রকর আসিয়া কান মলিয়া হাতের তুলি কাড়িয়া লইল বলিয়া। স্বল্পতোয়া নদীর কতকটা অংশ বোধ করি গ্রামবাসীরা পরিষ্কৃত করিয়াছে, সম্মুখের সেই স্বচ্ছ কালো অল্পপরিসর জলটুকুর উপরে ছোট ছোট রেখায় চাদের ও সন্ধাতারার আলো পাশাপাশি পড়িয়া ঝিকিমিকি করিতেছে—যেন কষ্টিপাথরে ঘষিয়া স্তাকরা সোনীর দাম যাচাই করিতেছে । কাছে কোথাও বনের মধ্যে বোধ করি অজস্র কাঠমল্লিকা ফুটিয়াছে, তাহারই গন্ধে সমস্ত বাতাসটা ভারী হইয়া উঠিয়াছে এবং নিকটে কোন গাছে অসংখ্য বকের বাসা হইতে শাবকগণের একটানা ঝুমঝুম শব্দ বিচিত্র মাধুর্ষ্যে অবিরাম কানে আসিয়া পশিতেছে। এসবই ভালো এবং যে দুটা লোক তদগত-চিত্তে জড়ভরতের মত বলিয়া আছে তাহারাও কবি সন্দেহ নাই। কিন্তু এ দেখিতে এই জঙ্গলে সন্ধ্যাকালে আসি নাই । নবীন বলিয়াছিল একপাল বোষ্টমী আছে, এবং সকলের সেরা বোষ্টমী কমললতা আছে । তাহারা কোথায় ? ডাকিলাম, গহর । গহর ধ্যান ভাঙিয়া হতবুদ্ধির মত আমার দিকে চাহিয়া রহিল। বাবাজী তাহাকে একটা ঠেলা দিয়া বলিল, গোসাই , তোমার শ্ৰীকান্ত না ? গহর দ্রুতবেগে উঠিয়া আমাকে সজোরে বাহুপাশে আবদ্ধ করিল। তাহার আবেগ থামিতে চাহে না এমনি ব্যাপার ঘটিল। কোনমতে নিজেকে যুক্ত কৱিৰ। ৰসিদ্ধ পড়িলাম, বলিলাম, বাবাজী আমাকে চিনলেন কি করে ? •š