পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (দশম সম্ভার).djvu/২৪২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ বাক্যালাপ পূৰ্ব্ব হইতেই বন্ধ চলিতেছিল, এখন সেটা দৃঢ়তর হইল এইমাত্র । নীচের ঘরে শয়ন ও ভোজন । হরিশ আদালতে যায় আসে, বাহিরের ঘরে একাকী বসিয়া কাটায়-নূতন কিছুই নয়। আগে সন্ধ্যার সময়ে একবার করিয়া ক্লাবে গিয়া বসিত, এখন সেটুকু বন্ধ হইয়াছে। কারণ সহরের সেইদিকে লাবণ্যর বাসা। তাহার মনে হয় পতিপ্রাণা ভাৰ্য্যার দুই চক্ষু দশ চক্ষু হইয়া দশ দিক হইতে পতিকে অহরহ নিরীক্ষণ করিতেছে । তাহার বিরাম নাই, বিশ্রাম নাই, মাধ্যাকর্ষণের ন্যায় তাহা নিত্য। স্নানের পরে আশির দিকে চাহিয়া তাহার মনে হইত, সতীসাধ্বীর এই অক্ষয় প্রেমের আগুনে তাহার কলুষিত দেহের নশ্বর মেদ-মঙ্গা-মাংস শুষ্ক ও নিষ্পাপ হইয়া অত্যন্ত দ্রুত উচ্চতর লোকের জন্য প্রস্তুত হইয়া উঠিতেছে। তাহার আলমারির মধ্যে একখানা কালী সিংহের মহাভারত ছিল, সময় যখন কাটিত না তখন তাহা হইতে সে বাছিয়া বাছিয়া সতী নারীর উপাখ্যান পড়িত। কি তার প্রচও বিক্রম ও কতই না অদ্ভূত কাহিনী ! স্বামী পাপী-তাপী যাহাই হোক, কেবলমাত্র স্ত্রীর সতীত্বের জোরেই সমস্ত পাপ মুক্ত হইয়া অন্তে বল্পকাল তাহারা একত্রে বাস করে । কল্পকাল যে ঠিক কত হরিশ জানিত না, কিন্তু সে যে কম নহে, এবং মুনি-ঋষিদের লেখা শাস্ত্রবাক্য যে মিথ্যা নহে, এই কথা মনে করিয়া তাহার সর্বাঙ্গ অবশ হইয়া উঠিত। পরলোকের ভরসায় জলাঞ্জলি দিয়া সে বিছানায় শুইয়া মাঝে মাঝে ইহলোকের ভাবনা ভাবিত। কিন্তু কোন পথ নাই। সাহেবদের হইলে মামলামকদ্দমা খাড়া করিয়া এতদিনে যা-হোক একটা ছাড়-রফা করিয়া ফেলিত, মুসলমানদের হইলে তিন তালাক দিয়া বহুপূৰ্ব্বেই চুকাইয়া ফেলিত ; কিন্তু নিরীহ, এক পত্নীব্রত ভদ্র বাঙালী- না, কোন উপায় নাই। ইংরাজি-শিক্ষায় বহু-বিবাহ ঘুচিয়াছে, —বিশেষতঃ নিৰ্ম্মলা, চন্দ্ৰ-সূৰ্য্য তাহার মুখ দেখিতে পায় না, অতি-বড় শত্ৰুও যাহার সতীৰে বিন্দুমাত্র কলঙ্ক লেপন করিতে পারে না, বস্তুতঃ স্বামী ভিন্ন যাহার ধ্যান-জ্ঞান নাই, তাহাকে পরিত্যাগ ! বাপ রে ; নিৰ্ম্মল, নিষ্কলুষ হিন্দুসমাজের মধ্যে কি আর মুখ দেখাইতে পরিবে ! দেশের লোকে খাই খাই করিয়া হয়ত তাহাকে খাইয়াই ফেলিবে । ভাবিতে ভাবিতে চোখ-কান গরম হইয়া উঠিত, বিছানা ছাড়িয়া মাথায় মুখে জল দিয়া বাকী রাতটুকু সে চেয়ারে বসিয়া কাটাইয়া দিত। এমনি করিয়া বোধ হয় মাসাধিক কাল গত হইয়া গেছে, হরিশ আদালতে বাহির হইতেছিল, ঝি আসিয়া একখানা চিঠি তাহার হাতে দিল। কছিল, জবাবের জন্য লোক দাড়িয়ে অাছে।