পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (দ্বাদশ সম্ভার).djvu/১৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শেষের পরিচয় । তারক মিনতি করিয়া কহিল, আর দশ মিনিট ভাই। সত্যি মিথ্যে স্বাই হোক, রাত্রের গাড়িতে যেতেই হবে। রাখাল বলিল, কেন শুনি ? কথাটা আমার বিশ্বাস হোলো না বুঝি ? তারক ইহার জবাব দিল না, কহিল, অথচ এমনি অভ্যাস হয়ে গেছে যে, দিনান্তে একবার দেখা না হলে প্রাণটা যেন ইপিয়ে ওঠে । রাখাল কহিল, আমারই তা হয় না বুঝি ? ইহার পরে দুজনেই ক্ষণকাল চুপ করিয়া রহিল। তারক বলিল, বেঁচে যদি থাকি, বড় দিনের ছুটিতে হয়তো আবার দেখা হবে। ততদিন— তারক আঙুল হইতে একটা বহু-ব্যবহৃত সোনার শিল-আঙটি খুলিয়া টেবিলের একধারে রাখিয়া দিল, কহিল, তাই রাখাল, তোমার কাছে আমি কুড়ি টাকা ধারি— কথাটা শেষ হইল না—এ কি তার বন্ধক না-কি ? বলিতে বলিতে রাখাল ছো মারিয়া আঙটিটা তুলিয়া লইয়া বোকের মাথায় জানলা দিয়া ফেলিয়া দিতেছিল, তারক হাতটা ধরিয়া ফেলিয়া স্নিগ্ধকণ্ঠে কহিল, আরে না না, বন্ধক নয়—বেচলে এর দাম দশটা টাকাও কেউ দেবে না—এ আমার স্মরণ-চিহ্ন, যাবার আগে তোমার হাতে নিজের হাতে পরিয়ে যাবে। এই বলিয়া সে জোর করিয়া বন্ধুর আণ্ডলে পরাইয়া দিল। বলিল, দশ মিনিট সময় চেয়ে নিয়েছিলাম, কিন্তু পোনর মিনিট হয়ে গেছে, এবার তোমার ছুটি নাও, পোশাক-টোষাক পরে নাও—এই বলিয়া সে হাসিল । মহিলা-মজলিশের চেহারা তখন রাখালের মনের মধ্যে মান হইয়া গেছে, সে চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় পাশাপাশি দুই বন্ধুর ছবি পড়ল। রাখাল বেঁটে, গোল-গাল, গৌরবর্ণ, তাহার পরিপুষ্ট মুখের পরে একটি সহৃদয় সরলতা যেন অত্যন্ত ব্যক্ত--মামুষটি যে সত্যই ভালোমানুষ তাহাতে সন্দেহ জন্মায় না, কিন্তু তারকের চেহারা সে শ্রেণীরই নয়। সে দীর্ঘাকৃতি, কৃশ, গায়ের রঙটা প্রায় কালোর ধার ঘে’সিয়া আছে । বাহিরে প্রকাশিত নয় বটে, কিন্তু ঠাহর করিলেই সন্দেহ হয়, লোকটি বোধ হয় বলিষ্ঠ। মুখ দেখিয়া হঠাৎ কোন ধারণা করা কঠিন ; কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে একটি আশ্চৰ্য্য বৈশিষ্ট্য আছে। আয়ত বা স্বন্দর নয়, কিন্তু মনে হয় যেন নির্ভর করা চলে। স্বখে দুঃখে ভার সহিবার ইহার শক্তি আছে। বয়স সাতাশজাটাশ, রাখালের চেয়ে দু-তিন বছরের ছোট, কিন্তু কিলে যেন তাহাকেই বড় বলিয়া उवष छ्न्न । রাখাল হঠাৎ জোর দিয়া বলিয়া উঠিল, কিন্তু আমি বলচি তোমার যাওয়া উচিত নয়। কেন ?