পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (সপ্তম সম্ভার).djvu/১৭৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ হইল এবং অবরুদ্ধ কবাটের ভিতর হইতে কোন প্রকার লাড়া-শব্দ না পাইয়া সে মিনিট-দুই চুপ করিা থাকিয় তাহার পর আস্তে আস্তে দ্বার ঠেলিয়া সামনেই যাহা দেখিতে পাইল তাহাতে একই কালে মুক্তির তীব্র আবেগে ও বিকট ভয়ে ক্ষশকালের নিমিত্ত তাহার সমস্ত দেহমন যেন পাষাণ হইয়া গেল। ঘরটা অন্ধকার, শুধু ওদিকের একটা ভাঙা জানালা দিয়া খানিকটা আলো ঢুকিয়া মেঝের উপর পড়িয়াছে। সেইখানে সেই আলো-মাধারের মধ্যে একান্ত অপরিচ্ছন্ন ধূলা-বালির উপরে সুরেশ চিৎ হইয়া শুইয়া আছে। তাহার গায়ে তখনও সেই-সব জামাকাপড়, শুধু কেবল খোলা ব্যাগটার ভিতর হইতে কতকগুলো জিনিসপত্র ইতস্তত: ছড়ানো । .* চক্ষের পলকে তাহার শেষ কথাগুলো অচলার মনে পড়িল , সে ডাক্তার, সে শুধু মানুষের জীবনটা ধরিয়া রাখিবার বিদ্যাই শিথিয়ছিল তাহ নয়, তাহাকে নিঃশব্দে বাহির করিয়া দিবার কৌশলও তাহার অবিদিত ছিল না। মনে পড়িল, নিদারুণ ভুলের জন্ত তাহার সেই উৎকট আত্মগ্ননি ; মনে পড়িল, তাহার সেই বিদায় চাওয়া, সেই আশ্বাস দেওয়া—সৰ্ব্বোপরি তাহার সেই বারংবার প্রায়শ্চিত্ত করার নিষ্ঠুর ইঙ্গিত ; সমস্তই একসঙ্গে এক নিশ্বাসে যেন ওই অবলুষ্ঠিত দেহটার কেবল একটিমাত্র পরিণামের কথাই তাহার কানে কানে কহিয়া দিল । সেইখানে সেই স্বার ধরিয়া সে ধীরে ধীরে বসিয়া পড়িল—তাহার এমন সাহস হইল না যে, আর ঘরে প্রবেশ করে । কিন্তু এইবার ওই অচেতন দেহটার প্রতি চাহিয়া তাহার দুই চক্ষু ফাটিয়া জল বাহির হইয়া পড়িল । যে তাহারই জন্য এত বড় দুনর্ণমের বোঝা মাথায় লইয়া হতাশ্বাসে এমন করিয়া এই পৃথিবী হইতে চিরদিনের তরে বিদায় লইয়া গেল, অপরাধ তাহার যত গুরুতরই হোক, তাহাকে মার্জনা করিতে পারে না, এত বড় কঠিন হৃদয় সংসারে অল্পই আছে ; এবং আজই প্রথম তাহার কাছে তাহার মিজের অপরাধ ও সুস্পষ্ট হইয়া দেখা দিল । স্কুরেশের সহিত সেই প্রথম দিনের পরিচয় হইতে সেদিন পর্য্যস্ত যত কিছু কামনা-বাসনা, যত ভুল-ভ্রাস্তি, যত মোহ, য'ত ছলনা, যত আগ্রহ-আবেগ উভয়ের মধ্য দিয়া বহিয়া গিয়াছে, সমস্তই একে একে ফিরিয়া ফিরিয়া দেখা দিতে লাগিল । তাহার নিজের আচরণ, তাহার পিতার আচরণ—অকস্মাং সৰ্ব্বাঙ্গ শিহরিয়া মনে হইল, শুধু কেবল নিজের নয়, অনেকের, অনেক পাতকের গুরুভার বহন করিয়াই আজ সুরেশ যে বিচারকের পদপ্রান্তে গিয়া উপনীত হইয়াছে, সেখানে সে নিঃশব্দে মুখ বুজিয়া সমস্ত শাস্তি স্বীকার করিয়া লইবে, কিংবা একটি একটি করিয়া সকল দুঃখ অভিযোগ ব্যক্ত করিয়া তাহার ক্ষমা ভিক্ষা চাহিবে। »ፄ•