পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (সপ্তম সম্ভার).djvu/২২৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গৃহদাই গ্রামের দুই-চারিজন বৃদ্ধ প্রতিবেশী মাঝে মাঝে র্তাহার সহিত আলাপ করিতে আসিত, কিন্তু তিনি নিজে কখনও সঙ্কোচে কাহারও গৃহে যাইতেন না । মৃণাগ অনুরোধ করিলে হাসিয়া বলিতেন, কাজ কি মা ! আমার মত মেচ্ছের কারও বাড়ি না যাওয়াই ত ভাল । মৃণাল কহিত, তা হলে তারাই বা আসবে কেন ? বৃদ্ধ এ-কথার কোন জবাব না দিয়া ছাতাটি মাথায় দিয়া মাঠের পথে বাহির হইয়া পড়িতেন। সেখানে চাষীদের সঙ্গে তিনি যাচিয়া আলাপ করিতেন । তাহাদের মুখ-দুঃখের কথা, গৃহস্থালীর কথা, স্যায়-অন্যায় পাপ-পুণ্যের কথা—এমনি কত কি আলোচনা করিতে বেলা বাড়িয়া উঠিলে তবে ঘরে ফিরিতেন। প্রত্যহ সকালে চা খাওয়ার পরে এই ছিল তার কাজ । জন্মকাল হইতে র্তাহারা চিরদিন কলিকাতাবাসী । শহরের বাহিরে যে অসংখ্য পল্লীগ্রাম, তাহার সহিত যোগস্থত্র তাহদের বহুপুরুষ পূৰ্ব্বেই ছিন্ন হইয়া গিয়াছে—আত্মীয়-কটুম্বও ধৰ্ম্মান্তর-গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তিরোহিত হইয়াছে, অতএব অধিকাংশ নাগরিকের ন্যায় তিনিও যে কিছুই ন! জানিয়াও ইহাদের সম্বন্ধে বিবিধ অদ্ভূত ধারণা পোষণ করিবেন, তাহাও বিচিত্র নয়। যে অশিক্ষিত অগণিত কৃষিজীবী স্বদূর পল্লীতেই সারাজীবন কাটাইয়া দেয়, সহরের মুখ দেখা যাহাদের ভাগ্যে কদাচিৎ ঘটে, তাহাদিগকে তিনি একপ্রকার পশু বলিয়াই জানিতেন এবং সেই সমাজটাকেও বন্ত সমাজ বলিয়াই বুঝিয়া রাখিয়াছিলেন ; কিন্তু আজ দুর্ভাগ্য যখন তাহার তীক্ষ্ণ বিষ-দাত দুটো তাহার মৰ্ম্মের মাঝখানে বিদ্ধ করিয়া সমস্ত মনটাকে নিজের সমাজ হইতে বিমুখ করিয়া দিল, তখন যতই এইসকল লেখা-পড়া-বিহীন পল্লীবাসী দরিদ্র কৃষকদের সহিত র্তাহার পরিচয় ঘনিষ্ঠ হইয়া উঠিতে লাগিল, ততই একদিকে যেমন র্তাহার প্রীতি ও শ্রদ্ধা উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিতে লাগিল, অন্যদিকে তেমনই র্তাহার আপনার সমাজ, তাহার আচার ও আচরণ, তাহার শিক্ষা ও সংস্কার, তাহার ধর্ম, তাহার সভ্যতা, তাহার বিধি-বিধান সমস্তর বিরুদ্ধেই তাহার অন্তর বিদ্বেষ ও বিতৃষ্ণায় পরিপূর্ণ হইয়া উঠিতে লাগিল । তিনি স্পষ্টই দেখিতে লাগিলেন, ইহারা লেখাপড়া না-জানা সত্ত্বেও অশিক্ষিত নয়। বহুযুগের প্রাচীন সভ্যতা আজও ইহাদের সমাজের অস্থিমজ্জায় মিশিয়া আছে । নীতির মোটা কথাগুলো ইহারা জানে। কোন ধর্মের বিরুদ্ধে ইহাদের বিদ্বেষ নাই ; কারণ জগতের সকল ধৰ্ম্মই যে মুলে এক এবং তেত্রিশ কোটী দেব-দেবীকে অমান্ত না করিয়াও যে একমাত্র ঈশ্বরকে স্বীকার করা যায়, এই জ্ঞান তাহাদের আছে এবং কাহারও অপেক্ষাই কম নাই। হিন্দুর ভগবান ও মুসলমানের জাল্লাও যে একই বস্তু, এ সত্যও তাহাদের অবিদিত নাই । - ২১৭ مواد س-۹