পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (সপ্তম সম্ভার).djvu/২৫৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ অচলা আসিয়া যখন নীরবে খাটিয়ার একধারে তাহার গায়ের কাছেই উপবেশন করিল, কিছুক্ষণের নিমিত্ত সে তেমনি নিৰ্মীলিত-নেত্ৰে মৌন হুইয়া রহিল, ভদ্রত রক্ষা করিতে সামান্ত একটা ‘এসো বলিয়াও ডাকিতে পারিল না। শিশুকাল হইতে চিরদিন অত্যধিক যত্ন-সাদরে ললিত-পালিত হইয়া আবেগ ও প্রবৃত্তির বশেই সে চলিয়াছে, ইহীদের সংযত করার শিক্ষা তাহার কোনকালে হয় নাই । এই শিক্ষা জীবনে সে প্রথম পাইয়াছিল কেবল সেইদিন, যেদিন তাহার মুখের হাসিকে পদাঘাত করিয়া মুখ ফিরাইয়া মহিম ঘরে চলিয়া গেল। সেদিন এক নিমেষে তাহার বুকের মধ্যে নীরবে যে কি বিপ্লব বহিয়া গেল, সে শুধু অন্তর্যামীই জানিলেন এবং আজও কেবল তিনিই দেখিলেন, ঐ শাস্ত অচঞ্চল দেহটার সর্বাঙ্গ ব্যাপিয়া কত বড় ঝড় প্রবাহিত হইতেছে। সেদিনও মহিমের আঘাতকে সে যেমন করিয়া সম্ভ করিয়াছিল, আজও তেমনি করিয়াই সে তাহার উন্মত্ত আবেগের সহিত নিঃশৰে লড়াই করিতে লাগিল—তাহার লেশমাত্ৰ আক্ষেপ প্রকাশ পাইতে দিল না । এমন করিয়া যে কতক্ষণ কাটিত বলা যায় না, কিন্তু বাহকদের আহবানে রঘুবীর বাহিরে চলিয়া গেলে, সেই শব্দে মুরেশ ধীরে ধীরে চোখ মেলিয়া চাহিল। কহিল, তুমি আমার চিঠি পেয়েচ ? অচলা মুখ না তুলিয়াই আস্তে আস্তে বলিল, না । স্বরেশ একটু বিস্ময় প্রকাশ করিয়া কহিল, চিঠি না পেয়েই এসেচ, আশ্চৰ্য্য ! যাই হোক, এ ভালই হ'ল যে একবার দেখা হ’ল । বলিয়া একটা কথার জন্য তাহার আনত মুখের প্রতি একমুহূৰ্ত্ত চাহিয়া থাকিয়া নিজেই কহিল, আমার জন্য তোমাকে অনেক দুঃখ পেতে হ’ল—খুব সম্ভব যতদিন বঁাচবে, এর জের মিটবে না, কিন্তু সমস্ত ভুল হয়েছিল এই যে, মহিমকে তুমি যে এতটা বেশি ভালবাসতে তা আমিও বুঝিনি, বোধ হয় তুমিও কোনদিন বুঝতে পারোনি ! না ? কিন্তু অচলা তেমনি অধোমুখে নিরুত্তর বসিয়া বুহিল দেখিয়া সে আবার বলিল, তা ছাড়া আমার বিশ্বাস, মানুষের মন বলে স্বতন্ত্র কোন একটা বস্তু নেই। যা আছে, সে এই দেহটারই ধৰ্ম্ম । ভালবাসাও তাই। ভেবেছিলাম, তোমার দেহটাকে কোনমতে পেলে মনটাও পাবো, তোমার ভালবাস ও দুষ্প্রাপ্য হবে না—কে জানে হয়ত সত্যিই কোনদিন ভাগ্য স্বপ্রসন্ন হ'তো—হয়ত যা সৰ্ব্বস্ব দিয়ে এমন করে চেয়েছিলাম, তাই তুমি একদিন নিজের ইচ্ছেয় আমাকে ভিক্ষে দিতে। কিন্তু আর তার সময় নেই, আমি অপেক্ষ করবার অবসর পেলাম না। বলিয়া সে পুনরায় কচুয়ে ভৱ দিয়া মাথা তুলিল এবং সদ্ধার ক্ষীণ আলোকের মধ্যে নিজের দুই চক্ষের দৃষ্টি তীক্ষ করিয়া অচলার আনত মুখের প্রতি নিবদ্ধ করিয়া স্তব্ধ হইয়া রহিল। ३9b”