পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (সপ্তম সম্ভার).djvu/৩৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ আঁচলা, একটু তাড়া দাও—বেলা বারোটা বেজে গেছে। বেয়ার, ইত্যাদি উচ্চকণ্ঠে ডাকাডাকি করিতে করিতে তিনি নিজেই বাহির হইয়া গেলেন। অচলা এতক্ষণ স্থির হইয়া দাড়াইয়াছিল। এখনও কোন প্রকার চাঞ্চল্য প্রকাশ করিল না । পিতা চলিয়া যাইবার পরে আস্তে আস্তে বলিল, আপনি আমাদের এখানে কি কিছু খেতে পারবেন ? স্বরেশ মুখ তুলিয়া অচলার মুখের পানে কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া বলিল, আপনি কি বলেন ? আপনি কখনই ত ব্রাহ্ম-বাড়িতে খান না । মা, খাইনে। কিন্তু আপনি এনে দিলে খাবো। একটুখানি থামিয়া বলিল, আপনি বোধ হয় ভাবচেন, আমি তামাসা করচি ; তা নয়। আপনি হাতে করে দিলে আমি সত্যি খাবো ; বলিয়া চাহিয়া রহিল। এইবার অচলা একটুখান মুখ নীচু করিয়া হাসি গোপন করিল ; কহিল, যথার্থই আমি ভেবেছিলুম আপনি ঠাট্টা করচেন। কাল পর্য্যন্তও যাদের বাড়িতে যেতে আপনার ঘৃণার অবধি ছিল না, আজ তাদেরই একজনের ছোয়া খেতে কি করে আপনার প্রবৃত্তি হবে, আমি ত ভেবে পাচ্ছিনে সুরেশবাবু। স্বরেশ মান-মুখে ব্যথিতস্বরে কহিল, তবে এতক্ষণ পরে কি এই ভেবে পেলেন যে, আপনার হাতে খেতে আমার ঘৃণা হবে ? অচলা বলিল, কিন্তু এই ভাবনাই ত স্বাভাবিক সুরেশবাবু। আপনার মত একজন উচ্চশিক্ষিত ভদ্রলোকের চিরদিনের বদ্ধমূল সামাজিক সংস্কার হঠাৎ একদিনে অকারণে ভেসে যাবে, এইটেই কি ভাবতে পারা সহজ ? মুরেশ কহিল, না, সহজ নয় । কিন্তু অকারণে ভেসে যাচ্ছে—তাই বা ভাবচেন কেন ? কারণ থাকতেও ত পারে, বলিয়া এমনি করিয়াই চাহিয়া রহিল যে, জবাব দিতে গিয়া অচলা একেবারে বিস্মিত হইয়া গেল। তাহার কথাটায় সে যে আঘাত পাইয়াছে, তাহা সে মুখ দেখিয়াই বুঝিয়াছিল, এবং একপ্রকার হিংস্র আনন্দও উপভোগ করিতেছিল। কিন্তু সে বেদন যে অকস্মাৎ এক মুহূর্তে তাহার সমস্ত মুখখানাকে একেবারে ছাইয়ের মত শুদ্ধ করিয়া দিতে পারে—তা সে ভাবেও নাই, ইচ্ছাও করে নাই। তাই নিজেও ব্যথা পাইয়া কথাটাকে সহজ রহস্যালাপে পরিণত করিতে, জোর করিয়া একটু হাসিয়া বলিল, ভেবেই দেখুন আপনার মত কঠোর প্রতিজ্ঞ লোকও— সুরেশ বলিল, ই, ভেসে যায়। তাহার গলার স্বয় কঁাপিতে লাগিল। কহিল, আপনি একটা দিনের কথা বলছিলেন–কিন্তু জানেন আপনি, একদিনের ভূমিকম্পে অৰ্দ্ধেক দুনিয়াটা পাতালের মধ্যে ডুবে যেতে পারে? একটা দিন কম সময় নয় । ২৬