পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8 সংকলন ছিল না। কিন্তু সংগ্ৰহ করিতে শিখিলেই যে নিমাণ করিতে শেখা হইল ধরিয়া লওয়া হয় সেইটেই একটা মস্ত ভুল। সংগ্রহ এবং নিমাণ যখন একই সঙ্গে অলেপ অপে অগ্রসর হইতে থাকে তখনই কাজটা পাকা রকমে হয়। অতএব ছেলে যদি মানুষ করিতে চাই তবে ছেলেবেলা হইতেই তাহাকে মানুষ করিতে আরম্ভ করিতে হইবে, নতুবা সে ছেলেই থাকিবে, মানুষ হইবে না। শিশুকাল হইতেই, কেবল স্মরণশক্তির উপর সমস্ত ভর না দিয়া, সঙ্গে সঙ্গে যথাপরিমাণে চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তির স্বাধীন পরিচালনার অবসর দিতে হইবে। সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত কেবলই লাঙল দিয়া চাষ এবং মই দিয়া ঢেলা ভাঙা, কেবলই ঠেঙা লাঠি, মুখপথ এবং একজামিন— আমাদের এই ‘মানব-জনম'-আবাদের পক্ষে, আমাদের এই দলভ ক্ষেত্রে সোনা ফলাইবার পক্ষে যথেষ্ট নহে। এই শকে ধন্লির সঙ্গে, এই অবিশ্রাম কষণপীড়নের সঙ্গে রস থাকা চাই। কারণ মাটি যত সরস থাকে ধান তত ভালো হয়। তাহার উপর আবার এক-একটা বিশেষ সময় আসে যখন ধান্যক্ষেত্রের পক্ষে বটি বিশেষরাপে আবশ্যক। সে সময়টি অতিক্রম হইয়া গেলে হাজার ব্যষ্টি হইলেও আর তেমন সফল ফলে না। বয়োবিকাশেরও তেমনি একটা বিশেষ সময় আছে যখন জীবন্ত ভাব এবং নবীন কল্পনা সকল জীবনের পরিণতি এবং সরসতা সাধনের পক্ষে অত্যাবশ্যক। ঠিক সেই সময়টিতে যদি সাহিত্যের আকাশ হইতে খুব এক পশলা বর্ষণ হইয়া যায় তবে ধন্য রাজা পণ্য দেশ। নবোভিন্ন হদয়াকুরগালি যখন অন্ধকার মাতৃভূমি হইতে বিপুল পথিবী এবং অনন্ত নীলাবরের দিকে প্রথম মাথা তুলিয়া দেখিতেছে, প্রচ্ছন্ন জন্মান্তঃপরের বারদেশে আসিয়া বাঁহঃসংসারের নবীন কৌতুহল চারি দিকে আপন শীষ প্রসারণ করিতেছে, তখন যদি ভাবের সমীরণ এবং চিরানন্দলোক হইতে আলোক এবং আশীবাদধারা নিপতিত হয়, তবেই তাহার সমস্ত জীবন যথাকালে সফল সরস এবং পরিণত হইতে পারে। কিন্তু সেই সময় যদি কেবল শাক ধলি এবং তপ্ত বালকো, কেবল নীরস ব্যাকরণ এবং বিদেশী অভিধান তাহাকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে তবে পরে মনুষলধারায় বর্ষণ হইলেও, য়রোপীয় সাহিত্যের নব নব জীবন্ত সত্য, বিচিত্র কল্পনা এবং উন্নত ভাবসকল লইয়া দক্ষিণে বামে ফেলাছড়া করিলেও সে আর তেমন সফলতা লাভ করিতে পারে না, সাহিত্যের অন্তনিহিত জীবনীশক্তি আর তাহার জীবনের মধ্যে তেমন সহজভাবে প্রবেশ করিতে পারে না।