পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১০১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ছেলে-ভুলানো ছড়া বাংলাভাষায় ছেলে ভুলাইবার জন্য যে-সকল মেয়েলি ছড়া প্রচলিত আছে, কিছুকাল হইতে আমি তাহা সংগ্ৰহ করিতে প্রবত্ত ছিলাম। আমাদের ভাষা এবং সমাজের ইতিহাস -নিণয়ের পক্ষে সে ছড়াগুলির বিশেষ মুল্য থাকিতে পারে, কিন্তু তাহাদের মধ্যে যে-একটি সহজ স্বাভাবিক কাব্যরস আছে সেইটিই আমার নিকট অধিকতর আদরণীয় বোধ হইয়াছিল। আমার কাছে কোনটা ভালো লাগে বা না লাগে এই কথা বলিয়া সমালোচনার মুখবন্ধ করিতে ভয় হয়। কারণ, যাহারা সনিপণ সমালোচক, এরুপ রচনাকে তাঁহারা অহমিকা বলিয়া অপরাধ লইয়া থাকেন। কিন্তু আজ আমি যে কথা বলিতে বসিয়াছি তাহার মধ্যে আত্মকথার কিঞ্চিৎ অংশ থাকিতেই হইবে। ছেলে-ভুলানো ছড়ার মধ্যে আমি যে রসাসবাদ করি, ছেলেবেলাকার সমতি হইতে তাহাকে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেখা আমার পক্ষে অসম্ভব। এই ছড়াগুলির মাধ্য কতটা নিজের বাল্যসমতি এবং কতটা সাহিত্যের চিরসথায়ী আদশের উপর নিভার করিতেছে, তাহা নির্ণয় করিবার উপযুক্ত বিশেলষণশক্তি বৰ্তমান লেখকের নাই। এ কথা গোড়াতেই কবলে করা ভালো। বষ্টি পড়ে টাপর টপের নদী এল বান' এই ছড়াটি বাল্যকালে আমার নিকট মোহমন্ত্রের মতো ছিল এবং সেই মোহ এখনো আমি ভুলিতে পারি নাই। আমি আমার সেই মনের মধে অবস্থা স্মরণ করিয়া না দেখিলে পষ্ট বঝিতে পারিব না, ছড়ার মাধ্য এবং উপযোগিতা কী। বুঝিতে পারিব না, কেন এত মহাকাব্য এবং খণ্ডকাব্য, এত তত্ত্বকথা এবং নীতিপ্রচার, মানবের এত প্রাণপণ প্রযত্ন, এত গলদঘম ব্যয়াম প্রতিদিন ব্যথ এবং বিস্মত হইতেছে, অথচ এই-সকল অসংগত অর্থহীন যদচ্ছাকৃত শেলাকগলি লোকমিতিতে চিরকাল প্রবাহিত হইয়া আসিতেছে। এই-সকল ছড়ার মধ্যে একটি চিরত্ব আছে। কোনোটির কোনো কালে কোনো রচয়িতা ছিল বলিয়া পরিচয়মাত্র নাই এবং কোন শকের কোন তারিখে কোনটা রচিত হইয়াছিল এমন প্রশ্ন কাহারো মনে উদয় হয় না। এই স্বাভাবিক চিরত্বগণে ইহারা আজ রচিত হইলেও পরাতন এবং সহস্ৰ বৎসর পবে রচিত হইলেও নতেন। ভালো করিয়া দেখিতে গেলে শিশর মতো পরাতন আর কিছুই নাই। দেশ কাল শিক্ষা প্রথা অনুসারে বয়স্ক মানবের কত নতেন পরিবতন হইয়াছে,