পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১৩০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


১২8 সংকলন যে নৌকারোহণে ভ্রমণের সংকল্প আছে ইহাও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিবার যোগ্য, কিন্তু পাঠকগণ শেষ ছত্রের প্রতি বিশেষ লক্ষ করিয়া দেখিবেন। আমরা যদি সবশ্রেষ্ঠ ইংরেজের দোকান হইতে আজানসমঃখিত বট কিনিয়া অত্যন্ত মচ মচ শব্দ করিয়া বেড়াই, তথাপি লোকে তাহাকে জতা অথবা জাতি বলিবে মাত্র। কিন্তু খোকাবাবর অতি ক্ষদ্র কোমল চরণযগেলে ছোটো ঘন্টি-দেওয়া অতি ক্ষদ্র সামান্য মল্যের রাঙা জতাজোড়া, সেটা হইল জতুয়া। পাটই দেখা যাইতেছে জতার আদরও অনেকটা পদসম্প্রমের উপরেই নিভর করে, তাহার অন্য মল্যে কাহারো খবরেই আসে না। সবশেষে, উপসংহারকালে আর-একটি কথা লক্ষ্য করিয়া দেখিবার আছে। যেখানে মানুষের গভীর স্নেহ, অকৃত্রিম প্রীতি, সেইখানেই তাহার দেবপজা। যেখানে আমরা মানুষকে ভালোবাসি সেইখানেই আমরা দেবতাকে উপল করি। ঐ যে বলা হইয়াছে। নিরলে বসিয়া চাঁদের মুখ নিরখি, ইহা দেবতারই ধ্যান। শিশর ক্ষুদ্র মুখখানির মধ্যে এমন কী আছে যাহা নিরীক্ষণ করিয়া দেখিবার জন্য, যাহা পরিপন্ণরপে উপলব্ধি করিবার জন্য অরণ্যের নিরালার মধ্যে গমন করিতে ইচ্ছা হয়—মনে হয়, সমস্ত সংসার সমস্ত নিত্যনৈমিত্তিক ক্লিয়াকম এই আনন্দভাণ্ডার হইতে চিত্তকে বিক্ষিত করিয়া দিতেছে! যোগীগণ যে অমত-লালসায় পানাহার ত্যাগ করিয়া অরণ্যের মধ্যে অক্ষুব্ধ অবসর অন্বেষণ করিতেন, জননী নিজের সন্তানের মখে সেই দেবদলভ আমতরসের সন্ধান প্রাপ্ত হইয়াছেন, তাই তাঁহার অন্তরের উপাসনা-মন্দির হইতে এই গাথা উচ্ছসিত হইয়া উঠিয়াছে : ধনকে নিয়ে বনকে যাব, সেখানে খাব কাঁ। নিরলে বসিয়া চাঁদের মুখ নিরখি। সেইজন্য ছড়ার মধ্যে প্রায়ই দেখিতে পাওয়া যায়, নিজের পত্রের সহিত দেবকীর পত্রকে অনেক পথলেই মিশাইয়া ফেলা হইয়াছে। অন্য দেশের মনষ্যে দেবতায় এরপ মিলাইয়া দেওয়া দেবাপমান বলিয়া গণ্য হইত। কিন্তু আমার বিবেচনায় মনষ্যের উচ্চতম মধরতম গভীরতম সম্প্রবন্ধসকল হইতে দেবতাকে সদরে স্বতন্ত্র করিয়া রাখিলে মনুষ্যত্বকেও অপমান করা হয় এবং দেবত্বকেও আদর করা হয় না। আমাদের ছড়ার মধ্যে মতের শিশ বগের দেবপ্রতিমার সঙ্গে যখন-তখন এক হইয়া গিয়াছে—সেও অতি সহজে, অতি অবহেলে— তাহার জন্য স্বতন্ত্র চালচিত্রেরও আবশ্যক হইতেছে না। শিশু-দেবতার অতি অদ্ভুত অসংগত অর্থহীন চালচিত্রের মধ্যেই সবগের দেবতা কখন অলক্ষিতে শিশর সহিত মিশিয়া আপনি আসিয়া দাঁড়াইতেছেন।