পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১৩৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রাজসিংহ S२१ ভালোবাসাবাসির কথা একটাও নাই—বহনকালসঞ্চিত প্রণয়ের কথা কিছ নাই— হে প্রাণ, হে প্রাণাধিকা, সে-সব কিছুই নাই—ধিক। এই গ্রন্থ-বর্ণিত পারগণের চরিত্রের, বিশেষত সত্রীচরিত্রের মধ্যে বড়ো একটা দ্রুততা আছে। তাহারা বড়ো বড়ো সাহসের এবং নৈপণ্যের কাজ করে, অথচ তৎপশ্চাবে যথেষ্ট ইতস্তত অথবা চিন্তা করে না। সন্দেরী বিদাংরেখার মতো এক নিমেষে মেঘাবরোধ ছিন্ন করিয়া লক্ষ্যের উপর গিয়া পড়ে, কোনো প্রস্তরভিত্তি সেই প্রলয়গতিকে বাধা দিতে পারে না। সত্ৰীলোক যখন কাজ করে তখন এমনি করিয়াই কাজ করে। তাহার সমগ্র মন প্রাণ লইয়া, বিবেচনা চিন্তা বিসজন দিয়া, একেবারে অব্যবহিত ভাবে উদ্দেশ্যসাধনে প্রবত্ত হয়। কিন্তু যে হদয়বৃত্তি প্রবল হইয়া তাহার প্রাতাহিক গহকর্মসীমার বাহিরে তাহাকে অনিবায বেগে আকষণ করিয়া আনে, পাঠককে পাব হইতে তাহার একটা পরিচয়, একটা সংবাদ দেওয়া আবশ্যক। বঙ্কিমবাব তাহা প্রাপরি দেন নাই। সেইজন্য রাজসিংহ প্রথম পড়িতে পড়িতে মনে হয়, সহসা এই উপন্যাসজগৎ হইতে মাধ্যাকর্ষণশক্তির প্রভাব যেন অনেকটা হ্রাস হইয়া গিয়াছে। আমাদিগকে যেখানে কন্টে চলিতে হয়, এই উপন্যাসের লোকেরা সেখানে লাফাইয়া চলিতে পারে। সংসারে আমরা চিন্তা শঙ্কা সংশয় -ভারে ভারাকান্ত, কাষক্ষেত্রে সর্বদাই বিধাপরায়ণ মনের বোঝাটা বহিয়া বেড়াইতে হয়—কিন্তু রাজসিংহ-জগতে অধিকাংশ লোকের যেন আপনার ভার নাই। যাহারা আজকালকার ইংরেজি নভেল বেশি পড়ে তাহাদের কাছে এই লঘতা বড়ো বিস্ময়জনক। আধুনিক ইংরেজি নভেলে পদে পদে বিশ্লেষণএকটা সামান্যতম কায্যের সহিত তাহার দরতম কারণপরপরা গাঁথিয়া দিয়া সেটাকে বহদাকার করিয়া তোলা হয়। ব্যাপারটা হয়তো ছোটো, কিন্তু তাহার নথিটা বড়ো বিপর্যয়। আজকালকার নভেলিস্টরা কিছুই বাদ দিতে চান না, তাঁহাদের কাছে সকলই গম্ভীরতর। এইজন্য উপন্যাসে সংসারের ওজন ভয়ংকর বাড়িয়া উঠিয়াছে। ইংরেজের কথা জানি না, কিন্তু আমাদের মতো পাঠককে তাহাতে অত্যন্ত ক্লিষ্ট করে। এইজন্য আধনিক উপন্যাস আরম্ভ করিতে ভয় হয়। মনে হয়, কম ক্লান্ত মানবহীদয়ের পক্ষে বাস্তবজগতের চিন্তাভার অনেক সময় যথেষ্টর অপেক্ষা বেশি হইয়া পড়ে, আবার যদি সাহিত্যও নিদয় হয় তবে আর পলায়নের পথ থাকে না। সাহিত্যে আমরা জগতের সত্য চাই, কিন্তু জগতের ভার क्लार्गश् ना।