পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১৪২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


> ○○ সংকলন ক্ষুদ্র জীবনটি আমার নিকট কতখানি বহং হইয়া দেখা দিল। সেই যে এক:ি অজ্ঞাত অখ্যাত মখে নিবোধ লোক বসিয়া বসিয়া ঈষৎ গ্রীবা হেলাইয়া কলম খাড়া করিয়া ধরিয়া একমনে নকল করিয়া যাইত, তাহাকে তাহার পিসিমা আপন নিঃসন্তান বৈধব্যের সমস্ত সঞ্চিত নেহরাশি দিয়া মানুষ করিয়াছেন। সন্ধ্যাবেলায় শ্রান্তদেহে শান্য বাসায় ফিরিয়া যখন সে সবহস্তে উনান ধরাইয়া পাক চড়াইত, যতক্ষণ অন্ন টগবগা করিয়া না ফটিয়া উঠিত ততক্ষণ কম্পিত অনিশিখার দিকে একদস্টে চাহিয়া সে কি সেই দরকুটিরবাসিনী স্নেহশালিনী কল্যাণময়ী পিসিমার কথা ভাবিত না। একদিন যে তাহার নকলে ভুল হইল, ঠিকে মিল হইল না, তাহার উচ্চতন কর্মচারীর নিকট সে লাঞ্ছিত হইল, সেদিন কি সকালের চিঠিতে তাহার পিসিমার পীড়ার সংবাদ পায় নাই। এই নগণ্য লোকটার প্রতিদিনের মঙ্গলবাতার জন্য একটি স্নেহপরিপর্ণ পবিত্র হৃদয়ে কি সামান্য উৎকণ্ঠা ছিল! এই দরিদ্র যুবকের প্রবাসবাসের সহিত কি কম করণা কাতরতা উদবেগ জড়িত হইয়া ছিল! সহসা সেই রাত্রে এই নিবাণপ্রায় ক্ষুদ্র প্রাণশিখা এক অমল্য মহিমায় আমার নিকটে দীপ্যমান হইয়া উঠিল। সমস্ত রাত্রি জাগিয়া তাহার সেবাশ্যশ্রষা করিলাম, কিন্তু পিসিমার ধনকে পিসিমার নিকট ফিরাইয়া দিতে পারিলাম না—আমার সেই ঠিকা মহেনরির মৃত্যু হইল। ভীমে দ্ৰোণ ভীমাজনে খুব মহৎ, তথাপি এই লোকটিরও মাল্য অলপ নহে। তাহার মল্য কোনো কবি অনমান করে নাই, কোনো পাঠক স্বীকার করে নাই, তাই বলিয়া সে মল্য পথিবীতে অনাবিকৃত ছিল না, একটি জীবন আপনাকে তাহার জন্য একান্ত উৎসর্গ করিয়াছিল—কিন্তু খোরাক-পোশাক-সমেত লোকটার বেতন ছিল আট টাকা, তাহাও বারোমাস নহে। মহত্ত্ব আপনার জ্যোতিতে আপনি প্রকাশিত হইয়া প্রেমের আলোকে প্রকাশ করিতে হয়—পিসিমার ভালোবাসা দিয়া দেখিলে আমরা সহসা দীপ্যমান হইয়া উঠি। যেখানে অন্ধকারে কাহাকেও দেখা যাইতেছিল না সেখানে প্রেমের আলোক ফেলিলে সহসা দেখা যায়, মানুষে পরিপণ। স্রোতস্বিনী দয়ানিগধ মুখে কহিল, তোমার ঐ বিদেশী মহরির কথা তোমার কাছে পাবে শুনিয়াছি। জানি না, উহার কথা শুনিয়া কেন আমাদের হিন্দপথানী বেহারা নিহরকে মনে পড়ে। সম্প্রতি দটি শিশসন্তান রাখিয়া তাহার সাঁ মরিয়া গিয়াছে। এখনো সে কাজকর্ম করে, দপরেবেলা বসিয়া পাখা টানে, কিন্তু এমন শাক শীর্ণ ভগ্ন লক্ষীছাড়ার মতো হইয়া গেছে!