পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১৫১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কাব্যের তাৎপয* N86. শ্রবণহি শনল, শ্রতিপথে পরশ না গেল।” আবার এই প্রাণপ্রদীপ্ত মঢ়ে সঙ্গিনীটিও লতার ন্যায় সহস্র শাখাপ্রশাখা বিস্তার করিয়া প্রেমপ্রতপ্ত সকোমল আলিঙ্গনপাশে জীবকে আচ্ছন্ন প্রচ্ছন্ন করিয়া ধরে, অলেপ অপে তাহাকে মগধ করিয়া আনে, অশ্রান্ত যত্নে ছায়ার মতো সঙ্গে থাকিয়া বিবিধ উপচারে তাহার সেবা করে, প্রবাসকে যাহাতে প্রবাস জ্ঞান না হয়, যাহাতে আতিথ্যের কটি না হইতে পারে, সেজন্য সর্বদাই সে তাহার চক্ষকৰ্ণ হস্তপদকে সতক করিয়া রাখে। এত ভালোবাসার পরে তব একদিন জীব এই চিরানগতা অনন্যাসন্তা দেহলতাকে ধলিশায়িনী করিয়া দিয়া চলিয়া যায়। বলে, “প্রিয়ে, তোমাকে আমি আত্মনিবিশেষে ভালোবাসি, তব আমি কেবল একটি দীঘনিশবাসমাত্র ফেলিয়া তোমাকে ত্যাগ করিয়া যাইব ।” কায়া তখন তাহার চরণ জড়াইয়া বলে, "বন্ধ, অবশেষে আজ যদি আমাকে ধন্লিতলে ধলিম স্টির মতো ফেলিয়া দিয়া চলিয়া যাইবে, তবে এতদিন তোমার প্রেমে কেন আমাকে এমন মহিমাশালিনী করিয়া তুলিয়ছিলে। হায়, আমি তোমার যোগ্য নই, কিন্তু তুমি কেন আমার এই প্রাণপ্রদীপদীপ্ত নিভৃত সোনার মন্দিরে একদা রহস্যান্ধকার নিশীথে অনন্ত সমদ্র পার হইয়া অভিসারে আসিয়াছিলে। আমার কোন গণে তোমাকে মগধ করিয়াছিল।”—এই করণ প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়া এই বিদেশী কোথায় চলিয়া যায় তাহা কেহ জানে না। সেই আজন্মমিলনবন্ধনের অবসান, সেই মাথরেযাত্রার বিদায়ের দিন, সেই কায়ার সহিত কায়াধিরাজের শেষ সম্ভাষণ—তাহার মতো এমন শোচনীয় বিরহদশ্য কোন প্রেমকাব্যে বর্ণিত আছে। ক্ষিতির মুখভাব হইতে একটা আসয় পরিহাসের আশঙ্কা করিয়া বোম কহিল, তোমরা ইহাকে প্রেম বলিয়া মনে কর না ; মনে করিতেছ, আমি কেবল রপেক অবলম্বনে কথা কহিতেছি। তাহা নহে। জগতে ইহাই সব প্রথম প্রেম এবং জীবনের সব প্রথম প্রেম সবাপেক্ষা যেমন প্রবল হইয়া থাকে, জগতের সব প্রথম প্রেমও সেইরুপ সরল অথচ সেইরপে প্রবল। এই আদি প্রেম, এই দেহের ভালোবাসা, যখন সংসারে দেখা দিয়াছিল তখনো পৃথিবীতে জলে পথলে বিভাগ হয় নাই—সেদিন কোনো কবি উপস্থিত ছিল না, কোনো ঐতিহাসিক জন্মগ্রহণ করে নাই, কিন্তু সেইদিন এই জলময় পাকময় অপরিণত ধরাতলে প্রথম ঘোষিত হইল যে—এ জগৎ যন্ত্রজগৎমাত্র নহে, প্রেম-নামক এক অনিবাচনীয় আনন্দময় বেদনাময় ইচ্ছাশক্তি পঙ্কের মধ্য হইতে পঙ্কজবন জাগ্রত করিয়া তুলিতেছেন, এবং সেই পদকজবনের উপরে আজ ভঙ্কের চক্ষে সৌন্দয়ারপো লক্ষয়ী এবং ভাবরপো সরস্বতী অধিষ্ঠান হইয়াছে।’