পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১৭৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


পাগল পশ্চিমের একটি ছোটো শহর। সম্মখে বড়ো রাস্তার পরপ্রান্তে খোড়ো চালগলার উপরে পাঁচ-ছয়টা তালগাছ বোবার ইঙ্গিতের মতো আকাশে উঠিয়াছে, এবং পোড়ো বাড়ির ধারে প্রাচীন তেতুলগাছ তাহার লঘচিক্কণ ঘন পল্লবভার সবজি মেঘের মতো তপে তপে সফাঁত করিয়া রহিয়াছে। চালশন্য ভাঙা ভিটার উপরে ছাগলছানা চরিতেছে, পশ্চাতে মধ্যাহ-আকাশের দিগন্তরেখা পর্যন্ত বনশ্রেণীর শ্যামলতা। আজ এই শহরটির মাথার উপর হইতে বর্ষ হঠাৎ তাহার কালো অবগঠিন একেবারে অপসারিত করিয়া দিয়াছে। আমার অনেক জরুরি লেখা পড়িয়া আছে—তাহারা পড়িয়াই রহিল। জানি তাহা ভবিষ্যতে পরিতাপের কারণ হইবে; তা হউক, সেটুকু স্বীকার করিয়া লইতে হইবে। পণতা কোন মতি ধরিয়া হঠাৎ কখন আপনার আভাস দিয়া যায় তাহা তো আগে হইতে কেহ জানিয়া প্রস্তুত হইয়া থাকিতে পারে না; কিন্তু যখন সে দেখা দিল তখন তাহাকে শুধহাতে অভ্যর্থনা করা যায় না। তখন লাভক্ষতির আলোচনা যে করিতে পারে সে খাব হিসাবি লোক, সংসারে তাহার উন্নতি হইতে থাকিবে; কিন্তু হে নিবিড় আষাঢ়ের মাঝখানে একদিনের জ্যোতিময় অবকাশ, তোমার শত্রমেঘমাল্যখচিত ক্ষণিক অভু্যদয়ের কাছে আমার সমস্ত জরুরি কাজ আমি মাটি করিলাম— আজ আমি ভবিষ্যতের হিসাব করিলাম না, আজ আমি নর কাছে বিকাইলাম। দিনের পর দিন আসে, আমার কাছে তাহারা কিছই দাবি করে না; তখন হিসাবের অঙ্কে ভুল হয় না, তখন সকল কাজই সহজে করা যায়। জীবনটা তখন এক দিনের সঙ্গে আর-এক দিন, এক কাজের সঙ্গে আর-এক কাজ, দিব্য গাঁথিয়া গাঁথিয়া অগ্রসর হয়, সমস্ত বেশ সমানভাবে চলিতে থাকে। কিন্তু হঠাৎ কোনো খবর না দিয়া একটা বিশেষ দিন সাতসমদ্রপারের রাজপত্রের মতো আসিয়া উপস্থিত হয়, প্রতিদিনের সঙ্গে তাহার কোনো মিল হয় না। ’ তখন মাহতের মধ্যে এতদিনকার সমস্ত খেই হারাইয়া যায়, তখন বাঁধা কাজের পক্ষে বড়োই মশকিল ঘটে। কিন্তু এইদিনই আমাদের বড়ো দিন; এই অনিয়মের দিন, এই কাজ নষ্ট করিবার দিন। যে দিনটা আসিয়া আমাদের প্রতিদিনকে বিপর্যস্ত করিয়া দেয় সেই দিন আমাদের আনন্দ। অন্য দিনগুলো বধিমানের দিন, সাবধানের দিন-আর এক-একটা দিন পরা পাগলামির কাছে সম্পর্ণভাবে উৎসগ করা। ।