পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১৭৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


থাকিবে তখন আমার বক্ষের মধ্যে ভয়ের আক্ষেপে যেন এই রন্দ্রসংগীতের তাল কাটিয়া না যায়। হে মন্ত্যুঞ্জয়, আমাদের সমস্ত ভালো এবং সমস্ত মন্দের মধ্যে তোমারই জয় হউক। আমাদের এই খেপা-দেবতার আবির্ভাব যে ক্ষণে ক্ষণে, তাহা নহে; সটির মধ্যে ইহার পাগলামি অহরহ লাগিয়াই আছে, আমরা ক্ষণে ক্ষণে তাহার পরিচয় পাই মাত্র। অহরহই জীবনকে মৃত্যু নবীন করিতেছে, ভালোকে মন্দ উজেনল করিতেছে, তুচ্ছকে অভাবনীয় মল্যবান করিতেছে। যখন পরিচয় পাই তখনি রাপের মধ্যে অপরাপ, বন্ধনের মধ্যে মন্তির প্রকাশ আমাদের কাছে জাগিয়া উঠে। আজিকার এই মেঘোমন্ত আলোকের মধ্যে আমার কাছে সেই অপরাপের মতি জাগিয়াছে। সম্মুখের ঐ রাস্তা, ঐ খোড়োচাল-দেওয়া মদির দোকান, ঐ ভাঙা ভিটা, ঐ সর গলি, ঐ গাছপালাগুলিকে প্রতিদিনের পরিচয়ের মধ্যে অত্যন্ত তুচ্ছ করিয়া দেখিয়াছিলাম। এইজন্য উহারা আমাকে বধ করিয়া ফেলিয়াছিল, রোজ এই কটা জিনিসের মধ্যেই নজরবন্দী করিয়া রাখিয়াছিল। আজ হঠাৎ তুচ্ছতা একেবারে চলিয়া গিয়াছে। আজ দেখিতেছি, চিরঅপরিচিতকে এতদিন পরিচিত বলিয়া দেখিতেছিলাম, ভালো করিয়া দেখিতেছিলামই না। আজ এই যাহা-কিছ, সমস্তকেই দেখিয়া শেষ করিতে পারিতেছি না। আজ সেই সমস্তই আমার চারি দিকে আছে, অথচ তাহারা আমাকে আটক করিয়া রাখে নাই, তাহারা প্রত্যেকেই আমাকে পথ ছাড়িয়া দিয়াছে। আমার পাগল এইখানেই ছিলেন; সেই অপব, অপরিচিত, অপরাপ, এই মদির দোকানের খোড়োচালের শ্রেণীকে অবজ্ঞা করেন নাই—কেবল, যে আলোকে তাঁহাকে দেখা যায় সে আলোক আমার চোখের উপরে ছিল না। আজ আশ্চর্য এই যে, ঐ সমখের দশ্য, ঐ কাছের জিনিস আমার কাছে একটি বহসন্দরের মহিমা লাভ করিয়াছে। উহার সঙ্গে গৌরীশঙ্করের তুষারবেষ্টিত দগমতা, মহাসমাদের তরঙ্গচঞ্চল দস্তরতা, আপনাদের সজাতিত্ব জ্ঞাপন করিতেছে। এমনি করিয়া হঠাৎ একদিন জানিতে পারা যায়, যাহার সঙ্গে অত্যন্ত ঘরকন্না পাতাইয়া বসিয়াছিলাম সে আমার ঘরকন্নার বাহিরে। আমি যাহাকে প্রতি মহাতের বাঁধা বরাদ্দ বলিয়া নিতান্ত নিশ্চিত হইয়া ছিলাম তাহার মতো দলভ দারায়ত্ত জিনিস কিছুই নাই। আমি যাহাকে ভালোরাপ জানি মনে করিয়া তাহার চারি দিকে সীমানা অকিয়া দিয়া খাতিরজমা হইয়া বসিয়া ছিলাম, সে দেখি কখন এক মহতের মধ্যে সমস্ত সীমানা পার হইয়া • ১২