পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২১০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


য়রোপযাত্রী ২২ আগস্ট, ১৮৯০ । তখন সৰ্য অস্তপ্রায়। জাহাজের ছাদের উপর হালের কাছে দাঁড়িয়ে ভারতবষের তীরের দিকে চেয়ে রইলাম। সমদ্রের জল সবুজ, তীরের রেখা নীলাভ, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। সন্ধ্যা রাত্রির দিকে এবং জাহাজ সমাদের মধ্যে ক্রমশই অগ্রসর হচ্ছে। বামে বোম্বাই বন্দরের এক দীঘরেখা এখনো দেখা যাচ্ছে; দেখে মনে হল, আমাদের পিতৃপিতামহের পরাতন জননী সমদ্রের বহদের পর্যন্ত ব্যাকুলবাহ বিক্ষেপ করে ডাকছেন, বলছেন, ‘আসন্ন রাত্রিকালে অকল সমদ্রে অনিশ্চিতের উদ্দেশে যাস নে; এখনো ফিরে আয়। ক্ৰমে বন্দর ছাড়িয়ে গেলাম। সন্ধ্যার মেঘাবত অন্ধকারটি সমদ্রের অনন্তশয্যায় দেহ বিস্তার করলে। আকাশে তারা নেই। কেবল দরে লাইটহাউসের আলো জলে উঠল; সমুদ্রের শিয়রের কাছে সেই কল্পিত দীপশিখা যেন ভাসমান সন্তানদের জন্যে ভূমিমাতার আশঙ্কাকুল জাগ্রত দটি। তখন আমার হৃদয়ের মধ্যে ঐ গানটা ধর্মনিত হতে লাগল : সাধের তবণী আমার কে দিল তরঙ্গে। জাহাজ বোবাই বন্দর পার হয়ে গেল। ভাসল তরী সন্ধেবেলা, ভাবিলাম এ জলখেলা, মধর বহিবে বায়, ভেসে যাব রঙ্গে। কিন্তু সাঁ-সিকনেসের কথা কে মনে করেছিল! যখন সবুজ জল ক্ৰমে নীল হয়ে এল এবং তরঙ্গে তরীতে মিলে গরতের আন্দোলন উপস্থিত করে দিলে তখন দেখলাম, সমুদ্রের পক্ষে জলখেলা বটে কিন্তু আমার পক্ষে নয়। ভাবলাম, এই বেলা মানে-মানে কুঠরির মধ্যে ঢকে কবলটা মুড়ি দিয়ে শয়ে পড়ি গে। যথাসত্বর ক্যাবিনের মধ্যে প্রবেশ করে কাঁধ হতে কবলটি একটি বিছানার উপর ফেলে দরজা বন্ধ করে দিলাম। ঘর অন্ধকার। বকলম, আলো নিভিয়ে দিয়ে দাদা তাঁর বিছানায় শয়েছেন। শারীরিক দুঃখ নিবেদন করে একটুখানি স্নেহ উদ্রেক করবার অভিপ্রায়ে জিজ্ঞাসা করলাম, দাদা, ঘামিয়েছেন কি। হঠাৎ নিতান্ত বিজাতীয় মোটা গলায় কে-একজন হহংকার দিয়ে উঠল, হাজ দ্যাট ? আমি বললাম বাস রে! এ তো দাদা নয়। তৎক্ষণাৎ বিনীত অনন্তপ্তস্বরে জ্ঞাপন করলাম, ক্ষমা করবেন, দৈবক্রমে ভুল কুঠরিতে প্রবেশ করেছি। অপরিচিত কণ্ঠ বললে, "অল রাইট। কবলটি পনশ্চ তুলে নিয়ে কাতর-শরীরে সংকুচিত চিত্তে বেরোতে গিয়ে দেখি