পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২১৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


য়রোপযাত্রী Հ0Գ প্রান্ত পর্যন্ত থম থম করছে। বহৎ সমুদ্র হঠাৎ যেন এমন একটা জায়গায় এসে থেমেছে যার উধ্যে আর গতি নেই, পরিবতন নেই; যা অনন্তকাল অবিশ্রাম চাঞ্চলের পরম পরিণতি, চরম নিবাণ। সাষাতের সময় চিল আকাশের নীলিমার যে-একটি সর্বোচ্চ সীমার কাছে গিয়ে সমস্ত বহং পাখা সমতলরেখায় বিস্তৃত করে দিয়ে হঠাৎ গতি বন্ধ করে দেয়, চিরচঞ্চল সমন্দ্র ঠিক যেন সহসা সেইরকম একটা পরম প্রশান্তির শেষ সীমায় এসে ক্ষণেকের জন্যে পশ্চিম অস্তাচলের দিকে মুখ তুলে একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে আছে। জলের যে চমৎকার বণবিকাশ হয়েছে সে আকাশের ছায়া কি সমুদ্রের আলো ঠিক বলা যায় না। যেন একটা মাহেন্দুক্ষণে আকাশের নীরব নিনিমেষ নীল নেত্রের দষ্টিপাতে হঠাৎ সমুদ্রের অতলপশ গভীরতার মধ্যে থেকে একটা আকস্মিক প্রতিভার দীপিত সফতি পেয়ে তাকে অপব মহিমান্বিত করে তুলেছে। ৩১ আগস্ট। আজ রবিবার। প্রাতঃকালে উঠে উপরের ডেকে চৌকিতে বসে সমদ্রের বায় সেবন করছি, এমন সময় নীচের ডেকে খসটানদের উপাসনা আরম্ভ হল। যদিও জানি, এদের মধ্যে অনেকেই শকিভাবে অভ্যস্ত মন্ত্র আউড়ে কল-টেপা আগিনের মতো গান গেয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তব এই-যে দশ্য, এই-যে গুটিকতক চঞ্চল ছোটো ছোটো মনুষ্য অপার সমুদ্রের মাঝখানে স্থির বিনম্নভাবে দাঁড়িয়ে গম্ভীর সমবেত কন্ঠে এক চির-অজ্ঞাত অনন্ত রহস্যের প্রতি ক্ষুদ্র মানবহৃদয়ের ভক্তি-উপহার প্রেরণ করছে, এ অতি আশ্চর্য । ৭ সেপ্টেম্বর। আজ সকালে ব্রিন্দিসি পৌছনো গেল। মেলগাড়ি প্রস্তুত ছিল, আমরা গাড়িতে উঠলাম। গাড়ি যখন ছাড়ল তখন টিপ টিপ করে বষ্টি আরম্ভ হয়েছে। আহার করে এসে একটি কোণে জানলার কাছে বসা গেল । দই ধারে কেবল আঙুরের খেত। তার পরে জলপাইয়ের বাগান। জলপাইয়ের গাছগুলো নিতান্ত বাঁকাচোরা, গ্রন্থি ও ফাটল -বিশিষ্ট, বলি অঙ্কিত বেটেখাটো রকমের, পাতাগুলো উধামুখ; প্রকৃতির হাতের কাজে যেমন একটি সহজ অনায়াসের ভাব দেখা যায়, এই গাছগুলোয় তার বিপরীত। এরা নিতান্ত দরিদ্র লক্ষীছাড়া, কায়ক্লেশে অস্টাবর হয়ে দড়িয়ে আছে; একএকটা এমন বেকে ঝ:কে পড়েছে যে পাথর উচু করে তাদের ঠেকো দিয়ে রাখতে হয়েছে।