পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২১৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


য়রোপযাত্রী Տ0ծ ফেনিয়ে ফলে নেচে কলরব করে পাথরগুলোকে সবাঙ্গ দিয়ে ঠেলে রেলগাড়ির সঙ্গে সমান দৌড়বার চেষ্টা করছে। বরাবর পাবতীর দিয়ে একটি পাবত্য পথ সমরেখায় স্রোতের সঙ্গে বেকে বেকে চলে গেছে। এক জায়গায় আমাদের সহচরীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হল। হঠাৎ সে দক্ষিণ থেকে বামে এসে এক অজ্ঞাত সংকীর্ণ শৈলপথে অন্তহিত হয়ে গেল। আবার হঠাৎ ডান দিকে আমাদের সেই পবসঙ্গিনী মাহতের জন্যে দেখা দিয়ে বামে চলে গেল। একবার দক্ষিণে, একবার বামে, একবার অন্তরালে। বিচিত্র কৌতুকচাতুরী। আবার হয়তো যেতে যেতে কোন-এক পবতের আড়াল থেকে সহসা কলহাস্যে করতালি দিয়ে আচমকা দেখা দেবে। সেই জলপাই এবং দ্রাক্ষা -কুঞ্জ অনেক কমে গেছে। বিবিধ শস্যের ক্ষেত্র এবং দীর্ঘ সরল পপলার গাছের শ্রেণী। ভুট্টা, তামাক, নানাবিধ শাকসবজি। মনে হয়, কেবলি বাগানের পর বাগান আসছে। এই কঠিন পবতের মধ্যে মানুষ বহুদিন থেকে বহ যত্নে প্রকৃতিকে বশ করে তার উচ্ছৃঙ্খলতা হরণ করেছে। প্রত্যেক ভূমিখন্ডের উপর মানুষের কত প্রয়াস প্রকাশ পাচ্ছে। এ দেশের লোকেরা যে আপনার দেশকে ভালোবাসবে তাতে আর কিছু আশ্চয* নেই। এরা আপনার দেশকে আপনার যত্নে আপনার করে নিয়েছে। এখানে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বহনকাল থেকে একটা বোঝাপড়া হয়ে আসছে, উভয়ের মধ্যে ক্ৰমিক আদান-প্রদান চলছে, তারা পরপর সপরিচিত এবং ঘনিষ্ঠ সম্পকে আবদ্ধ। এক দিকে প্রকান্ড প্রকৃতি উদাসীনভাবে দাঁড়িয়ে, আরএক দিকে বৈরাগ্যবদ্ধ মানব উদাসীন ভাবে শয়ে—য়রোপের সে ভাব নয়। এদের এই সন্দরী ভূমি এদের একান্ত সাধনার ধন, একে এরা নিয়ত বহন আদর করে রেখেছে। এ কী চমৎকার চিত্র। পবতের কোলে, নদীর ধারে, হ্রদের তীরে পপলারউইলো-বেষ্টিত কাননশ্রেণী। নিকণ্টক নিরাপদ নিরাময় ফলশস্যপরিপর্ণ প্রকৃতি প্রতিক্ষণে মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছে এবং মানুষকে বিগণ ভালোবাসছে। মানুষের মতো জীবের এই তো যোগ্য আবাসস্থান। মানুষের প্রেম এবং মানুষের ক্ষমতা যদি আপনার চতুদিককে সংহত সন্দর সমন্জেল করে না তুলতে পারে তবে তরকোটর-গহাগহর-বন-বাসী জন্তুর সঙ্গে তার প্রভেদ কী। ১১ সেপ্টেম্বর। লন্ডনে পৌছে সকালবেলায় আমাদের পরাতন বন্ধদের সন্ধানে বাহির হওয়া গেল।