পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২১৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


২১২ সংকলন তুমি মন্সত শহর, মস্ত দেশ, তোমার ক্ষমতা এবং ঐশ্বয্যের সীমা নেই। আর অধিক প্রমাণের আবশ্যক নেই। এখন আমি বাড়ি যেতে পারলে বাঁচ। সেখানে আমি সকলকে চিনি, সকলকে বঝি; সেখানে সমস্ত বাহ্যাবরণ ভেদ করে মনুষ্যত্বের আসবাদ সহজে পাই। সহজে উপভোগ করতে পারি, সহজে চিন্তা করতে পারি, সহজে ভালোবাসতে পারি। যেখানে আসল মানুষটি আছে সেখানে যদি অবাধে যেতে পারতুম তা হলে এখানকে আর প্রবাস বলে মনে হত না । অতএব সিথর করেছি, এখন বাড়ি ফিরব — ৭ অক্টোবর। টেমস জাহাজে একটা কেবিন স্থির করে আসা গেল। । পরশ জাহাজ ছাড়বে। ৯ অক্টোবর। জাহাজে ওঠা গেল। এবারে আমি একা। আমার সঙ্গীরা বিলাতে রয়ে গেলেন। ১০ অক্টোবর। সন্দের প্রাতঃকাল। সমদ্র সিথর। আকাশ পরিকার। সন্য উঠেছে। ভোরের বেলা কুয়াশার মধ্যে দিয়ে আমাদের ডান দিক হতে অলপ অলপ তীরের চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। অলেপ অপে কুয়াশার যবনিকা উঠে গিয়ে ওয়াইট বীপের পার্বত্য তাঁর এবং ভেন্টনর শহর ক্ৰমে ক্ৰমে প্রকাশ হয়ে পড়ল। { আজ অনেক রাত্রে নিরালায় একলা দাঁড়িয়ে জাহাজের কাঠরা ধরে সমদ্রের দিকে চেয়ে অন্যমনসকভাবে গন গন করে একটা দিশি রাগিণী ধরেছিলাম। তখন দেখতে পেলাম, অনেক দিন ইংরেজি গান গেয়ে গেয়ে মনের ভিতরটা যেন শ্রান্ত এবং অতৃপ্ত হয়ে ছিল। হঠাৎ এই বাংলা সরটা পিপাসার জলের মতো বোধ হল। সেই সারটি সমদ্রের উপর অন্ধকারের মধ্যে যেরকম প্রসারিত হল, এমন আর কোনো সরে কোথাও পাওয়া যায় বলে আমার মনে হয় না। আমার কাছে ইংরেজি গানের সঙ্গে আমাদের গানের এই প্রধান প্রভেদ ঠেকে যে, ইংরেজি সংগীত লোকালয়ের সংগীত; আর আমাদের সংগীত প্রকাণ্ড নিজন প্রকৃতির অনিদিষ্ট অনিবাচনীয় বিষাদের সংগীত। কানাড়া টোড়ি প্রভৃতি বড়ো বড়ো রাগিণীর মধ্যে যে গভীরতা এবং কাতরতা আছে সে যেন কোনো ব্যক্তিবিশেষের নয়, সে যেন অকল অসীমের প্রান্তবতী এই সংগীহীন বিশ্বজগতের।