পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২২৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ছিন্নপত্র २२> ভারি একটা যৌবনের মত্ততার ভাব। এ তব গড়ই নদী, এখান থেকে আবার পদ্মায় গিয়ে পড়তে হবে; তার বোধ হয় আর কল-কিনারা দেখবার জো নেই; সে মেয়ে বোধ হয় একেবারে উন্মাদ হয়ে খেপে নেচে বেরিয়ে চলেছে, সে আর কিছর মধ্যেই থাকতে চায় না। তাকে মনে করলে আমার কালীর মতি মনে হয়--নত্য করছে, ভাঙছে, এবং চুল এলিয়ে দিয়ে ছটে চলেছে। মাঝিরা বলছিল, নতন বর্ষায় পদ্মার খাব ধারা হয়েছে। ধার' কথাটা ঠিক ; তীব্রস্রোত যেন চকচকে খঙ্গের মতো—পাতলা ইপাতের মতো একেবারে কেটে চলে যায়, প্রাচীন ব্রিটনদের যন্ধেরথের চাকায় যেমন কুঠার বাঁধা, দইধারের তীর একেবারে অবহেলে ছারখার করে দিয়ে চলেছে। পথিবীর টান শিলাইদা, ২০ আগস্ট ১৮৯২ । রোজ সকালে চোখ চেয়েই আমার বা দিকে জল এবং ডান দিকে নদীতীর সমযকিরণে পলাবিত দেখতে পাই। এখানকার রৌদ্রে আমার মন ভারি উদাসীন হয়ে যায়। এর যে কী মানে ঠিক ধরতে পারি নে, এর সঙ্গে যে কী-একটা আকাঙ্ক্ষা জড়িত আছে ঠিক বুঝতে পারি নে। এ যেন এই বহৎ ধরণীর প্রতি একটা নাড়ীর টান। এক সময়ে যখন আমি এই পৃথিবীর সঙ্গে এক হয়ে ছিলম, যখন আমার উপর সবুজ ঘাস উঠত, শরতের আলো পড়ত, সযকিরণে আমার সদরবিস্তৃত শ্যামল অঙ্গের প্রত্যেক রোমকপ থেকে যৌবনের সুগন্ধি-উত্তাপ উত্থিত হতে থাকত, আমি কত দর-দরান্তর কত দেশ-দেশান্তরের জলপথলপবত ব্যাপ্ত করে উজ্জল আকাশের নীচে নিস্তব্ধভাবে শয়ে পড়ে থাকতুম, তখন শরৎ-স্যালোকে আমার বহৎ সবাঙ্গে যে-একটি আনন্দরস, একটি জীবনীশক্তি অত্যন্ত অব্যক্ত অধচেতন এবং অত্যন্ত প্রকাণ্ডভাবে সঞ্চারিত হতে থাকত তাই যেন খানিকটা মনে পড়ে। আমার এই-যে মনের ভাব এ যেন এই প্রতিনিয়ত অঙ্কুরিত মুকুলিত পলকিত সন্য সনাথা আদিম পথিবীর ভাব। যেন আমার এই চেতনার প্রবাহ পথিবীর প্রত্যেক ঘাসে এবং গাছের শিকড়ে শিকড়ে শিরায় শিরায় ধীরে ধীরে প্রবাহিত হচ্ছে—সমস্ত শস্যক্ষেত্র রোমাঞ্চিত হয়ে উঠছে, এবং নারকেল গাছের প্রত্যেক পাতা জীবনের আবেগে থর থর করে কপিছে। এই পথিবীর উপর আমার যে-একটি আন্তরিক আত্মীয় বৎসলতার ভাব আছে, ইচ্ছা করে সেটা ভালো করে প্রকাশ করতে—কিন্তু ওটা বোধ হয় অনেকেই ঠিকটি বাঝতে পারবে না। কী একটা কিচ্ছত রকমের মনে করবে ।