পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৩৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


२२b সংকলন পড়ে, পাতা নড়ে। আমার জীবনে এইটেই আদিকবির প্রথম কবিতা । সেদিনের আনন্দ আজও যখন মনে পড়ে তখন বুঝিতে পারি, কবিতার মধ্যে মিল জিনিসটার এত প্রয়োজন কেন। মিল আছে বলিয়াই কথাটা শেষ হইয়াও শেষ হয় না, তাহার বক্তব্য যখন ফরোয় তখনো তাহার ঝংকারটা ফরোয় না— মিলটাকে লইয়া কানের সঙ্গে মনের সঙ্গে খেলা চলিতে থাকে। এমনি করিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া সেদিন আমার সমস্ত চৈতন্যের মধ্যে জল পড়িতে ও পাতা নড়িতে লাগিল। এই শিশুকালের আর-একটা কথা মনের মধ্যে বাঁধা পড়িয়া গেছে । আমাদের একটি অনেক কালের খাজাঞ্চি ছিল, কৈলাস মখোজে তাহার নাম। সে আমাদের ঘরের আত্মীয়েরই মতো। লোকটি ভারি রসিক। সকলের সঙ্গেই তাহার হাসিতামাশা। সেই কৈলাস মখোজে আমার শিশুকালে অতি দ্রুতবেগে মস্ত একটা ছড়ার মতো বলিয়া আমার মনোরঞ্জন করিত। সেই ছড়াটার প্রধান নায়ক ছিলাম আমি এবং তাহার মধ্যে একটি ভাবী নায়িকার নিঃসংশয় সমাগমের আশা অতিশয় উজলভাবে বর্ণিত ছিল। এই-যে ভুবনমোহিনী বধটি ভবিতব্যতার কোল আলো করিয়া বিরাজ করিতেছিল, ছড়া শুনিতে শনিতে তাহার চিত্রটিতে মন ভারি উৎসকে হইয়া উঠিত। আপাদমস্তক তাহার যে বহমতুল্য অলংকারের তালিকা পাওয়া গিয়াছিল এবং মিলনোৎসবের যে অভূতপব সমারোহের বর্ণনা শনা যাইত, তাহাতে অনেক প্রবীণবয়স্ক সবিবেচক ব্যক্তির মন চঞ্চল হইতে পারিত, কিন্তু বালকের মন যে মাতিয়া উঠিত এবং চোখের সামনে নানাবণে বিচিত্র আশ্চর্য সুখচ্ছবি দেখিতে পাইত তাহার মল কারণ ছিল সেই দ্রুত-উচ্চারিত অনগ’ল শব্দচ্ছটা এবং ছন্দের দোলা। শিশুকালের সাহিত্যরসসক্ষেভাগের এই দলটো সমতি এখনো জাগিয়া আছে ; আর মনে পড়ে, বটি পড়ে টাপার-টপরে, নদেয় এল বান।' ঐ ছড়াটা যেন শৈশবের মেঘদত। এমনি করিয়া নিতান্ত শিশুবয়সেই আমার পড়া আরম্ভ হইল। চাকরদের মহলে যে-সকল বই প্রচলিত ছিল তাহা লইয়াই আমার সাহিত্যচর্চার সত্রপাত হয়। তাহার মধ্যে চাণক্যশেলাকের বাংলা অনুবাদ ও কৃত্তিবাসী রামায়ণই প্রধান। সেই রামায়ণ পড়ার একটা দিনের ছবি মনে পষ্ট জাগিতেছে। সেদিন মেঘলা করিয়াছে; দিদিমা— আমার মাতার কোনো-এক সম্পকে খড়ি—যে কৃত্তিবাসের রামায়ণ পড়িতেন সেই মাবেল-কাগজ-মণ্ডিত কোণছে’ড়ামলাট-ওয়ালা মলিন বইখানি কোলে লইয়া মায়ের ঘরের বারের কাছে পড়িতে