পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৩৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


বনস্মতি २२४ বসিয়া গেলাম। সম্মখে অন্তঃপরের আঙিনা ঘেরিয়া চৌকোণ বারান্দা; সেই বারান্দায় মেঘাচ্ছন্ন আকাশ হইতে অপরাহের লান আলো আসিয়া পড়িয়াছে। রামায়ণের কোনো-একটা করণ বর্ণনায় আমার চোখ দিয়া জল পড়িতেছে দেখিয়া, দিদিমা জোর করিয়া আমার হাত হইতে বইটা কাড়িয়া লইয়া গেলেন। ঘর ও বাহির আমাদের শিশুকালে ভোগবিলাসের আয়োজন ছিল না বলিলেই হয়। মোটের উপরে তখনকার জীবনযাত্রা এখনকার চেয়ে অনেক বেশি সাদাসিধা ছিল। আহারে আমাদের শৌখিনতার গন্ধও ছিল না। কাপড়চোপড় এতই যৎসামান্য ছিল যে, এখনকার ছেলের চক্ষে তাহার তালিকা ধরিলে সম্মানহানির আশঙ্কা আছে। বয়স দশের কোঠা পার হইবার পবে কোনোদিন কোনো কারণেই মোজা পরি নাই। শীতের দিনে একটা সাদা জামার উপরে আর-একটা সাদা জামাই যথেষ্ট ছিল। ইহাতে কোনোদিন আদষ্টকে দোষ দিই নাই। কেবল আমাদের বাড়ির দরজি নেয়ামং খলিফা অবহেলা করিয়া আমাদের জামায় পকেট-যোজনা অনাবশ্যক মনে করিলে দুঃখ বোধ করিতাম, কারণ, এমন বালক কোনো অকিঞ্চনের ঘরেও জন্মগ্রহণ করে নাই পকেটে রাখিবার মতো পথাবর-অস্থাবর সম্পত্তি যাহার কিছমাত্র নাই; বিধাতার কৃপায় শিশরে ঐশ্বব্য সম্বন্ধে ধনী ও নিধনের ঘরে বেশি কিছল তারতম্য দেখা যায় না। আমাদের চটিজতা একজোড়া থাকিত, কিন্তু পা-দুটা যেখানে থাকিত সেখানে নহে। প্রতি পদক্ষেপে তাহাদিগকে আগে আগে নিক্ষেপ করিয়া চলিতাম, তাহাতে যাতায়াতের সময় পদচালনা অপেক্ষা জাতীচালনা এত বাহুল্য পরিমাণে হইত যে, পাদকাসটির উদ্দেশ্য পদে পদে ব্যথ হইয়া যাইত। বাহির-বাড়িতে দোতলায় দক্ষিণ-পব কোণের ঘরে চাকরদের মহলে আমাদের দিন কাটিত। আমাদের এক চাকর ছিল তাহার নাম শ্যাম । শ্যামবর্ণ দোহারা বালক, মাথায় লম্ববা চুল, খলনা জেলায় তাহার বাড়ি। সে আমাকে ঘরের একটি নিদিষ্ট পথানে বসাইয়া, আমার চারি দিকে খড়ি দিয়া গণ্ডি কাটিয়া দিত। গভীর মুখ করিয়া তজনী তুলিয়া বলিয়া যাইত, গণ্ডির বাহিরে গেলেই বিষম বিপদ। বিপদটা আধিভৌতিক কি আধিদৈবিক তাহা পষ্ট করিয়া বঝিতাম না, কিন্তু মনে বড়ো একটা আশঙ্কা হইত। গণ্ডি পার হইয়া সাঁতার কী সবনাশ হইয়াছিল তাহা রামায়ণে পড়িয়াছিলাম, এইজন্য গণ্ডিটাকে নিতান্ত অবিশ্ববাসীর মতো উড়াইয়া দিতে পারিতাম না।