পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৩৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


૨૭ 0 সংকলন জানলার নীচেই একটি ঘাট-বাঁধানো পুকুর ছিল। তাহার পব ধারের প্রাচীরের গায়ে প্রকাণ্ড একটা চীনা বট, দক্ষিণ ধারে নারিকেলশ্রেণী। গণ্ডিবন্ধনের বন্দী আমি জানলার খড়খড়ি খলিয়া প্রায় সমস্ত দিন সেই পাকুরটাকে একখানা ছবির বহির মতো দেখিয়া দেখিয়া কাটাইয়া দিতাম। সকাল হইতে দেখিতাম, প্রতিবেশীরা একে একে স্নান করিতে আসিতেছে। তাহাদের কে কখন আসিবে আমার জানা ছিল। প্রত্যেকেরই সনানের বিশেষত্বটুকুও আমার পরিচিত। কেহ-বা দই কানে আঙল চাপিয়া ঝাপ ঝাপ করিয়া দ্রুতবেগে কতকগলা ডুব পাড়িয়া চলিয়া যাইত; কেহ-বা ডুব না দিয়া গামছায় জল তুলিয়া ঘন ঘন মাথায় ঢালিতে থাকিত; কেহ-বা জলের উপরিভাগের মলিনতা এড়াইবার জন্য বার বার দই হাতে জল কাটাইয়া লইয়া হঠাৎ একসময়ে ধাঁ করিয়া ডুব পাড়িত; কেহ-বা উপরের সিড়ি হইতেই বিনা ভূমিকায় সশব্দে জলের মধ্যে ঝাঁপ দিয়া পড়িয়া আত্মসমপণ করিত; কেহ-বা জলের মধ্যে নামিতে নামিতে এক নিশবাসে কতকগুলি শেলাক আওড়াইয়া লইত ; কেহ-বা ব্যস্ত, কোনোমতে স্নান সারিয়া লইয়া বাড়ি যাইবার জন্য উৎসকে; কাহারো-বা ব্যস্ততা লেশমাত্র নাই, ধীরে-সস্থে সনান করিয়া, গা মছিয়া, কাপড় ছাড়িয়া, কোঁচাটা দুই-তিনবার ঝাড়িয়া, বাগান হইতে কিছন-বা ফল তুলিয়া, মদমন্দ দোদলগতিতে সনানসিনগধ শরীরের আরামটিকে বায়তে বিকীর্ণ করিতে করিতে বাড়ির দিকে তাহার যাত্রা। এমনি করিয়া দপর বাজিয়া যায়, বেলা একটা হয়, ক্ৰমে পলকুরের ঘাট জনশন্য, নিস্তব্ধ। কেবল রাজহাঁস ও পাতিহাসগলা সারাবেলা ডুব দিয়া গগৈলি তুলিয়া খায়, এবং চঞ্চচালনা করিয়া ব্যতিব্যস্তভাবে পিঠের পালক সাফ করিতে থাকে। পাকরিণী নিজান হইয়া গেলে সেই বটগাছের তলাটা আমার সমস্ত মনকে অধিকার করিয়া লইত। তাহার গড়ির চারি ধারে অনেকগলো ঝারি নামিয়া একটা অন্ধকারময় জটিলতার সষ্টি করিয়াছিল। সেই কুহকের মধ্যে, বিশ্বের সেই একটা অসপটে কোণে যেন ভ্রমকুমে বিশেবর নিয়ম ঠেকিয়া গেছে। দৈবাৎ সেখানে যেন সব নয়াগের একটা অসম্ভবের রাজত্ব বিধাতার চোখ এড়াইয়া আজও দিনের আলোর মাঝখানে রহিয়া গিয়াছে। মনের চক্ষে সেখানে যে কাহাদের দেখিতাম এবং তাহাদের ক্লিয়াকলাপ যে কিরকম, আজ তাহা সপস্ট ভাষায় বলা অসম্ভব। এই বটকেই উদ্দেশ করিয়া একদিন লিখিয়াছিলাম : নিশিদিশি দাঁড়িয়ে আছ মথায় লয়ে জট ছোটো ছেলেটি মনে কি পড়ে, ওগো প্রাচীন বট।