পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৩৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


জীবনন্মতি ミ○○ মনে আমার ঔৎসক্যে ছিল। গ্রামের ঘরবসিত চণ্ডীমণ্ডপ, রাস্তাঘাট, খেলাধলো, হাটমাঠ, জীবনযাত্রার কল্পনা আমার হদয়কে অত্যন্ত টানিত। সেই পাড়াগাঁ এই গঙ্গাতীরের বাগানের ঠিক একেবারে পশ্চাতেই ছিল, কিন্তু সেখানে আমাদের যাওয়া নিষেধ। সেই পিছনে আমার বাধা রহিল, কিন্তু গঙ্গা সম্মুখ হইতে আমার সমস্ত বন্ধন হরণ করিয়া লইলেন। পাল-তোলা নৌকায় যখন-তখন আমার মন বিনা ভাড়ায় সওয়ারি হইয়া বসিত এবং যে-সব দেশে যাত্রা করিয়া বাহির হইত ভূগোলে আজ পর্যন্ত তাহাদের কোনো পরিচয় পাওয়া যায় নাই। অন্তঃপরের ছবি বাহিরের প্রকৃতি যেমন আমার কাছ হইতে দরে ছিল, ঘরের অতঃপরও ঠিক তেমনিই। সেইজন্য যখন তাহার যেটুকু দেখিতাম আমার চোখে যেন বাড়ির ভিতরে শয়ন করিতে চলিয়াছি; খড়খড়ে-দেওয়া ল’বা বারান্দাটাতে মিটমিটে লন্ঠন জলিতেছে; সেই বারান্দা পার হইয়া গোটা চার-পাঁচ অন্ধকার সিড়ির ধাপ নামিয়া একটি উঠান-ঘেরা অতঃপরের বারান্দায় আসিয়া প্রবেশ করিয়াছি, বারান্দার পশ্চিমভাগে পাব-আকাশ হইতে বাঁকা হইয়া জ্যোৎস্নার আলো আসিয়া পড়িয়াছে, বারান্দার অপর অংশগলি অন্ধকার, সেই একটুখানি জ্যোৎস্নায় বাড়ির দাসীরা পাশাপাশি পা মেলিয়া বসিয়া উরর উপর প্রদীপের সলিতা পাকাইতেছে এবং মদস্বেরে আপনাদের দেশের কথা বলাবলি করিতেছে —এমন কত ছবি মনের মধ্যে একেবারে অাঁকা হইয়া রহিয়াছে। তার পরে রাত্রে আহার সারিয়া বাহিরের বারান্দায় জল দিয়া পা ধুইয়া একটা মস্ত বিছানায় আমরা তিনজনে শ্যইয়া পড়িতাম, শঙ্করী কিবা প্যারী কিবা তিনকড়ি আসিয়া শিয়রের কাছে বসিয়া তেপাতের মাঠের উপর দিয়া রাজপত্রের ভ্রমণের কথা বলিত, সে কাহিনী শেষ হইয়া গেলে শয্যাতল নীরব হইয়া যাইত; দেয়ালের দিকে মুখ ফিরাইয়া শুইয়া ক্ষীণালোকে দেখিতাম, দেয়ালের উপর হইতে মাঝে মাঝে চুনকাম খসিয়া গিয়া কালোয় সাদায় নানাপ্রকারের রেখাপাত হইয়াছে; সেই রেখাগুলি হইতে আমি মনে মনে বহুবিধ অদ্ভূত ছবি উদ্ভাবন করিতে করিতে ঘুমাইয়া পড়িতাম, তার পরে অধরাত্রে উচ্চস্বরে হকি দিতে দিতে এক বারান্দা হইতে আর-এক বারান্দায় চলিয়া যাইতেছে।