পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৪০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


૨૭8 সংকলন শ্রীকণ্ঠবাব এই সময়ে একটি শ্রোতা লাভ করিয়াছিলাম, এমন শ্রোতা আর পাইব না। ভালো লাগিবার শক্তি ইহার এতই অসাধারণ যে, মাসিকপত্রের সংক্ষিপ্তসমালোচক-পদ-লাভের ইনি একেবারেই অযোগ্য। বন্ধ একেবারে সাপক বোম্বাই আমটির মতো—অম্বলরসের আভাস-মাত্র-বজিত—তাঁহার স্বভাবের কোথাও এতটুকু অশিও ছিল না। মাথাভরা টাক, গোঁফদাড়ি-কামানো নিগধ মধর মখে, মুখবিবরের মধ্যে দন্তের কোনো বালাই ছিল না, বড়ো বড়ো দই চক্ষ অবিরাম হাস্যে সমস্তেজবল। তাঁহার স্বাভাবিক ভারী গলায় যখন কথা কহিতেন তখন তাঁহার সমস্ত হাত মুখ চোখ কথা কহিতে থাকিত। ইনি সেকালের ফারসি-পড়া রসিক মানুষ, ইংরেজির কোনো ধার ধারিতেন না। । তাঁহার বামপাশেবর নিতাসঙ্গিনী ছিল একটি গড়গড়ি, কোলে কোলে সবদাই ফিরিত একটি সেতার এবং কন্ঠে গানের আর বিশ্রাম ছিল না। এই বন্ধটি আমার পিতার, তেমনি দাদাদের, তেমনি আমাদেরও বন্ধ ছিলেন। আমাদের সকলেরই সঙ্গে তাঁহার বয়স মিলিত । কবিতা শোনাইবার এমন অনকেল শ্রোতা সহজে মেলে না। ঝরনার ধারা যেমন এক-টকরা নড়ি পাইলেও তাহাকে ঘিরিয়া ঘিরিয়া নাচিয়া মাত করিয়া দেয়, তিনিও তেমনি যে-কোনো একটা উপলক্ষ পাইলেই আপন উল্লাসে উদবেল হইয়া উঠিতেন। গান সম্বন্ধে আমি শ্রীকণ্ঠবাবর প্রিয় শিষ্য ছিলাম। তাঁহার একটা গান ছিল— ‘ময় ছোড়ো ব্রজকি বাসরী। ঐ গানটি আমার মখে সকলকে শোনাইবার জন্য তিনি আমাকে ঘরে ঘরে টানিয়া লইয়া বেড়াইতেন। আমি গান ধরিতাম, তিনি সেতারে ঝংকার দিতেন এবং যেখানটিতে গানের প্রধান ঝোঁক ময় ছোড়েী, সেইখানটাতে মাতিয়া উঠিয়া তিনি নিজে যোগ দিতেন ও অশ্রাতভাবে সেটা ফিরিয়া ফিরিয়া আবৃত্তি করিতেন এবং মাথা নাড়িয়া মগধদষ্টিতে সকলের মখের দিকে চাহিয়া যেন সকলকে ঠেলা দিয়া ভালোলাগায় উৎসাহিত করিয়া তুলিতে চেষ্টা করিতেন। ইনি আমার পিতার ভক্ত বন্ধ ছিলেন। ই’হারই দেওয়া হিন্দি গান হইতে ভাঙা একটি ব্ৰহাসংগীত আছে— ‘অন্তরতর অন্তরতম তিনি যে, ভুলো না রে তাঁয়। এই গানটি তিনি পিতৃদেবকে শোনাইতে শোনাইতে আবেগে চৌকি ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইতেন। সেতারে ঘন ঘন ঝংকার দিয়া একবার বলিতেন, ‘অন্তরতর অন্তরতম তিনি যে': আবার পালটাইয়া লইয়া তাঁহার মখের সম্মখে হাত নাড়িয়া বলিতেন, ‘অন্তরতর অন্তরতম তুমি যে’। এই বন্ধ যেদিন আমার পিতার সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ করিতে আসেন তখন