পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৪৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


S○切 সংকলন না। আমার বোধ হইত, ছাত্রদের সেই ঔদাসীন্যের ব্যাঘাত তিনি মনের মধ্যেৎ অনুভব করিতেন কিন্তু নম্নভাবে প্রতিদিন তাহা সহ্য করিয়া লইতেন। আমি জানি না কেন, তাঁহার জন্য আমার মনের মধ্যে একটা বেদনা বোধ হইত। তাঁহার মুখশ্রী সন্দের ছিল না, কিন্তু আমার কাছে তাহার কেমন একটি আকর্ষণ ছিল। তাঁহাকে দেখিলেই মনে হইত, তিনি সবদাই আপনার মনের মধ্যে যেন একটি দেবোপাসনা বহন করিতেছেন, অন্তরের বৃহৎ এবং নিবিড় সতব্ধতায় তাঁহাকে যেন আবত করিয়া রাখিয়াছে। আধঘণ্টা আমাদের কপি লিখিবার সময় ছিল, আমি তখন কলম হাতে লইয়া অন্যমনস্ক হইয়া যাহা-তাহা ভাবিতাম। একদিন ফাদার দ্য পেনারান্দা এই ক্লাসের অধ্যক্ষতা করিতেছিলেন। তিনি প্রত্যেক বেঞ্চির পিছনে পদচারণা করিয়া যাইতেছিলেন। বোধ করি তিনি দুই-তিনবার লক্ষ্য করিয়াছিলেন, আমার কলম সরিতেছে না। এক সময়ে আমার পিছনে থামিয়া দাঁড়াইয়া নত হইয়া আমার পিঠে তিনি হাত রাখিলেন এবং অত্যন্ত সস্নেহ সবরে আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, টাগোর, তোমার কি শরীর ভালো নাই। —বিশেষ কিছু নহে, কিন্তু আজ পর্যন্ত তাঁহার সেই প্রশ্নটি ভুলি নাই। অন্য ছাত্রদের কথা বলিতে পারি না, কিন্তু আমি তাঁহার ভিতরকার একটি বৃহৎ মনকে দেখিতে পাইতাম, আজও তাহা স্মরণ করিলে আমি যেন নিভৃত নিস্তব্ধ দেবমন্দিরের মধ্যে প্রবেশ করিবার অধিকার পাই। রচনাপ্রকাশ এ-পর্যন্ত যাহা-কিছু লিখিতেছিলাম তাহার প্রচার আপনা-আপনির মধ্যেই বন্ধ ছিল। এমন সময়ে জ্ঞানাঙ্কুর নামে এক কাগজ বাহির হইল। কাগজের নামের উপযুক্ত একটি অঙ্কুরোদগত কবিও কাগজের কর্তৃপক্ষেরা সংগ্ৰহ করিলেন। আমার সমস্ত পদ্যপ্রলাপ এবং প্রথম যে গদ্য প্রবন্ধ লিখি তাহও এই জ্ঞানাঙ্কুরেই বাহির হয়। তাহা গ্রন্থ-সমালোচনা। তাহার একটা ইতিহাস আছে। তখন ভুবনমোহিনী-প্রতিভা নামে একটি কবিতার বই বাহির হইয়াছিল। বইখানি ভুবনমোহিনী-নাম-ধারিণী কোনো মহিলার লেখা বলিয়া সাধারণের ধারণা জমিয়া গিয়াছিল। সাধারণী কাগজে অক্ষয় সরকার মহাশয় এবং এডুকেশন-গেজেটে ভূদেববাব এই কবির অভু্যদয়কে প্রবল জয়বাদ্যের সহিত ঘোষণা করিতেছিলেন। আমি তখন ভুবনমোহিনী-প্রতিভা দুঃখসঙ্গিনী ও অবসর-সরোজিনী বই তিনখানি অবলম্ববন করিয়া জ্ঞানাঙ্কুরে এক সমালোচনা লিখিলাম।