পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৪৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


૨80 সংকলন লর্ড লিটনের সময় লিখিয়ছিলাম পদ্যে। তখনকার ইংরেজ গবমেন্ট রশিয়াকেই ভয় করিত, চোন্দ-পনেরো বছর বয়সের বালক-কবির লেখনীকে ভয় করিত না। এইজন্য সেই কাব্যে বয়সোচিত উত্তেজনা প্রভূতপরিমাণে থাকা সত্ত্বেও তখনকার প্রধান সেনাপতি হইতে আরম্ভ করিয়া পলিসের কতৃপক্ষ পর্যন্ত কেহ কিছমাত্র বিচলিত হইবার লক্ষণ প্রকাশ করেন নাই। সেটা পড়িয়াছিলাম হিন্দমেলায় গাছের তলায় দাঁড়াইয়া। শ্রোতাদের মধ্যে নবীন সেন মহাশয় উপস্থিত ছিলেন। আমার বড়ো-বয়সে তিনি একদিন এ কথা আমাকে সমরণ করাইয়া দিয়াছিলেন। জ্যোতিদাদার উদ্যোগে আমাদের একটি সভা হইয়াছিল। বন্ধ রাজনারায়ণ বাব ছিলেন তাহার সভাপতি। ইহা সবাদেশিকের সভা। কলিকাতার এক গলির মধ্যে এক পোড়ো বাড়িতে সেই সভা বসিত। সেই সভার সমস্ত অনুষ্ঠান রহস্যে আবত ছিল। বস্তুত তাহার মধ্যে ঐ গোপনীয়তাটাই একমাত্র ভয়ংকর ছিল। আমাদের ব্যবহারে রাজার বা প্রজার ভয়ের বিষয় কিছই ছিল না। আমরা মধ্যাহ্নে কোথায় কী করিতে যাইতেছি তাহা আমাদের আত্মীয়রাও জানিতেন না। বার আমাদের রন্ধ, ঘর আমাদের অন্ধকার, দীক্ষা আমাদের ঋকমন্ত্রে, কথা আমাদের চুপি চুপি—ইহাতেই সকলের রোমহর্ষণ হইত, আর বেশি কিছই প্রয়োজন ছিল না। আমার মতো অবাচীনও এই সভার সভ্য ছিল। এই সভায় আমরা এমন একটি খেপামির তপত হাওয়ার মধ্যে ছিলাম যে অহরহ উৎসাহে যেন আমরা উড়িয়া চলিতাম। লজা ভয় সংকোচ আমাদের কিছই ছিল না। এই সভায় আমাদের প্রধান কাজ-উত্তেজনার আগন পোহানো। বীরত্ব জিনিসটা কোথাও বা অসুবিধাকর হইতেও পারে, কিন্তু ওটার প্রতি মানুষের একটা গভীর শ্রদ্ধা আছে। সেই শ্রদ্ধাকে জাগাইয়া রাখিবার জন্য সকল দেশের সাহিত্যেই প্রচুর আয়োজন দেখিতে পাই। কাজেই যে অবস্থাতেই মানুষ থাক-না, মনের মধ্যে ইহার ধাক্কা না লাগিয়া তো নিৰ্ম্মতি নাই। আমরা সভা করিয়া, কল্পনা করিয়া, বাক্যালাপ করিয়া, গান গাহিয়া, সেই ধাক্কাটা সামলাইবার চেষ্টা করিয়াছি। মানুষের যাহা প্রকৃতিগত এবং তাহার সকলপ্রকার ছিদ্র বন্ধ করিয়া দিলে একটা যে বিষম বিকারের সন্টি করা হয় সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহই থাকিতে পারে না। একটা বহৎ রাজ্যব্যবস্থার মধ্যে কেবল কেরানিগিরির রাস্তা খোলা রাখিলে মানবচরিত্রের বিচিত্র শক্তিকে তাহার স্বাভাবিক স্বাস্থ্যকর চালনার ক্ষেত্র দেওয়া হয় না। রাজ্যের । মধ্যে বীরধমেরও পথ রাখা চাই নাহলে মানবককে পীড়া দেওয়া হয়। “