পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৪৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


জীবনস্মতি Հ8Տ তাহার অভাবে কেবলই গনপত উত্তেজনা অন্তঃশীলা হইয়া বহিতে থাকে— সেখানে তাহার গতি অত্যন্ত অদ্ভুত এবং পরিণাম অভাবনীয়। আমার বিশ্বাস সেকালে যদি গবমেন্টের সন্দিগ্ধতা অত্যন্ত ভীষণ হইয়া উঠিত তবে তখন আমাদের সেই সভার বালকেরা যে বীরত্বের প্রহসনমাত্র অভিনয় করিতেছিল তাহা কঠোর ট্রাজেডিতে পরিণত হইতে পারিত। অভিনয় সাঙ্গ হইয়া গিয়াছে, ফোর্ট উইলিয়মের একটি ইস্টকও খসে নাই এবং সেই প্যবসমতির আলোচনা করিয়া আজ আমরা হাসিতেছি। রবিবারে রবিবারে জ্যোতিদাদা দলবল লইয়া শিকার করিতে বাহির হইতেন। রবাহত অনাহত যাহারা আমাদের দলে আসিয়া জটিত তাহাদের অধিকাংশকেই আমরা চিনিতাম না। তাহাদের মধ্যে ছতার কামার প্রভৃতি সকল শ্রেণীরই লোক ছিল। এই শিকারে রক্তপাতটাই সবচেয়ে নগণ্য ছিল, অন্তত সেরাপ ঘটনা আমার তো মনে পড়ে না। শিকারের অন্য সমস্ত অনুষ্ঠানই বেশ ভরপর মাত্রায় ছিল—আমরা হত আহত পশুপক্ষীর অতি তুচ্ছ অভাব কিছমাত্র অনুভব করিতাম না। প্রাতঃকালেই বাহির হইতাম । বৌঠাকুরানী রাশীকৃত লাচি তরকারি প্রস্তুত করিয়া আমাদের সঙ্গে দিতেন। ঐ জিনিসটাকে শিকার করিয়া সংগ্ৰহ করিতে হইত না বলিয়াই একদিনও আমাদিগকে উপবাস করিতে হয় নাই। মানিকতলায় পোড়ো বাগানের অভাব নাই। আমরা যে-কোনো একটা বাগানে ঢাকিয়া পড়িতাম। পাকুরের বাঁধানো ঘাটে বসিয়া উচ্চনীচনিবিচারে সকলে একত্র মিলিয়া লুচির উপরে পড়িয়া মহাতের মধ্যে কেবল পারটাকে মাত্র বাকি রাখিতাম। ব্ৰজবাবও আমাদের অহিংস্ৰক শিকারীদের মধ্যে একজন প্রধান উৎসাহী। ইনি মেট্রোপলিটান কলেজের সুপারিন্টেডেণ্ট এবং কিছুকাল আমাদের ঘরের শিক্ষক ছিলেন। ইনি একদিন শিকার হইতে ফিরিবার পথে একটা বাগানে ঢকিয়াই মালীকে ডাকিয়া কহিলেন, "ওরে, ইতিমধ্যে মামা কি বাগানে আসিয়াছিলেন। মালী তাঁহাকে শশব্যস্ত হইয়া প্রণাম করিয়া কহিল, আজ্ঞে না, বাব তো আসে নাই। ব্ৰজবাব কহিলেন, "আচ্ছা, ডাব পাড়িয়া আন । সেদিন লাচির অন্তে পানীয়ের অভাব হয় নাই। আমাদের দলের মধ্যে একটি মধ্যবিত্ত জমিদার ছিলেন। তিনি নিষ্ঠাবান হিন্দ। তাঁহার গঙ্গার ধারে একটি বাগান ছিল। সেখানে গিয়া আমরা সকল সভ্য একদিন জাতিবর্ণনিবিচারে আহার করিলাম। অপরাহুে বিষম ঝড়। সেই ঝড়ে আমরা গঙ্গার ঘাটে দাঁড়াইয়া চীৎকার-শব্দে গান জড়িয়া দিলাম।