পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৫৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


জীবনস্মতি Ꭶ8Ꮈ মতি ধারণ করিয়া চলিতে লাগিল। আগে হইলে এটাকে অপরাধ বলিয়া গণ্য করিতাম কিন্তু এখন লেশমাত্র সংকোচবোধ হইল না। আমার কাব্য লেখার ইতিহাসের মধ্যে এই সময়টাই আমার পক্ষে সকলের চেয়ে সমরণীয়। কাব্যহিসাবে সন্ধ্যাসংগীতের মল্যে বেশি না হইতে পারে। আমি হঠাৎ একদিন আপনার ভরসায় যা-খাঁশি-তাই লিখিয়া গিয়াছি। সুতরাং সে লেখাটার মল্যে না থাকিতে পারে, কিন্তু খুশিটার মতুল্য আছে। গান ও কবিতা গীতিকলার নিজেরই একটি বিশেষ প্রকৃতি ও বিশেষ কাজ আছে। গানে যখন কথা থাকে তখন কথার উচিত হয় না সেই সযোগে গানকে ছাড়াইয়া যাওয়া, সেখানে সে গানেরই বাহনমাত্র। গান নিজের ঐশ্ববযেই বড়ো— বাক্যের দাসত্ব সে কেন করিতে যাইবে। বাক্য যেখানে শেষ হইয়াছে সেইখানেই গানের আরম্ভ। যেখানে অনিবাচনীয় সেইখানেই গানের প্রভাব। বাক্য যাহা বলিতে পারে না গান তাহাই বলে। গন গন করিতে করিতে যখনি একটা লাইন লিখিলাম—তোমার গোপন কথাটি সখী, রেথো না মনে— তখনি দেখিলাম, সরে যে জায়গায় কথাটা উড়াইয়া লইয়া গেল, কথা আপনি সেখানে পায়ে হাঁটিয়া গিয়া পৌছিতে পারিত না। তখন মনে হইতে লাগিল, আমি যে গোপন কথাটি শনিবার জন্য সাধাসাধি করিতেছি তাহা যেন বনশ্রেণীর শ্যামলিমার মধ্যে মিলাইয়া আছে, পণিমারাত্রির নিস্তব্ধ শত্রতার মধ্যে ডুবিয়া আছে, দিগন্তরালের নীলাভ সদরতার মধ্যে অবগঠিত হইয়া আছে—তাহা যেন সমস্ত জলপথল-আকাশের নিগাঢ় গোপন কথা । বহল বাল্যকালে একটা গান শুনিয়াছিলাম—তোমায় বিদেশিনী সাজিয়ে কে দিলে। সেই গানের ঐ একটিমাত্র পদ মনে এমন একটি অপরুপ চিত্র অকিয়া দিয়াছিল যে আজও ঐ লাইনটা মনের মধ্যে গঞ্জন করিয়া বেড়ায়। একদিন ঐ গানের ঐ পদটার মোহে আমিও একটি গান লিখিতে বসিয়াছিলাম। সবরগঞ্জেনের সঙ্গে প্রথম লাইনটা লিখিয়াছিলাম—“আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী—সঙ্গে যদি সরেট কু না থাকিত তবে এ গানের কী ভাব দাঁড়াইত বলিতে পারি না। কিন্তু ঐ সরের মন্ত্ৰগণে বিদেশিনীর এক অপরাপ মতি মনে জাগিয়া উঠিল। আমার মন বলিতে লাগিল, আমাদের এই জগতের মধ্যে একটি কোন বিদেশিনী আনাগোনা করে; কোন রহস্যসিন্ধর পরপারে ঘাটের উপরে তাহার বাড়ি; তাহাকেই শারদপ্রাতে, মাধবী রাত্রিতে, ক্ষণে ক্ষণে দেখিতে পাই; হাদয়ের মাঝখানেও মাঝে মাঝে তাহার