পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৫৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


૨ઉ O সংকলন হঠাৎ একটা কী উলটপালট হইয়া গেল। সদরসীটের রাস্তাটা যেখানে গিয়া শেষ হইয়াছে সেইখানে বোধ করি ফ্রী-স্কুলের বাগানের গাছ দেখা যায়। একদিন সকালে বারান্দায় দাঁড়াইয়া আমি সেই দিকে চাহিলাম। তখন সেই গাছগুলির পল্লবান্তরাল হইতে সযোদয় হইতেছিল। চাহিয়া থাকিতে থাকিতে হঠাৎ এক মহোতের মধ্যে আমার চোখের উপর হইতে যেন একটা পদা সরিয়া গেল। দেখিলাম, একটি অপরপ মহিমায় বিশ্বসংসার সমাচ্ছন্ন, আনন্দে এবং সৌন্দযে সবত্রই তরঙ্গিত। আমার হৃদয়ে স্তরে সতরে যে-একটা বিষাদের আচ্ছাদন ছিল তাহা এক নিমিষেই ভেদ করিয়া আমার সমস্ত ভিতরটাতে বিশেবর আলোক একেবারে বিচ্ছরিত হইয়া পড়িল। সেইদিনই নিঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি নিঝ"রের মতোই যেন উৎসারিত হইয়া বহিয়া চলিল। লেখা শেষ হইয়া গেল কিন্তু জগতের সেই আনন্দরাপের উপর তখনো যবনিকা পড়িয়া গেল না। এমনি হইল, আমার কাছে তখন কেহই এবং কিছই অপ্রিয় রহিল না। আমি বারান্দায় দাঁড়াইয়া থাকিতাম, রাস্তা দিয়া মটে মজর যে-কেহ চলিত তাহাদের গতিভঙ্গী, শরীরের গঠন, তাহদের মুখশ্রী আমার কাছে ভারি আশ্চর্য বলিয়া বোধ হইত; সকলেই যেন নিখিল সমুদ্রের উপর দিয়া তরঙ্গলীলার মতো বহিয়া চলিয়াছে। শিশুকাল হইতে কেবল চোখ দিয়া দেখাই অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছিল, আজ যেন একেবারে সমস্ত চৈতন্য দিয়া দেখিতে আরম্ভ করিলাম। রাস্তা দিয়া এক যবেক যখন আর-এক যুবকের কাঁধে হাত দিয়া হাসিতে হাসিতে অবলীলাক্লমে চলিয়া যাইত সেটাকে আমি সামান্য টনা বলিয়া মনে করিতে পারিতাম না—বিশ্বজগতে অতলপশ গভীরতার মধ্যে যে অফরান রসের উৎসব চারি দিকে হাসির ঝরনা ঝরাইতেছে সেইটাকে যেন দেখিতে পাইতাম । এই মহেতেই পথিবীর সবত্রই নানা লোকালয়ে, নানা কাজে, নানা আবশ্যকে কোটি কোটি মানব চঞ্চল হইয়া উঠিতেছে, সেই ধরণীব্যাপী সমগ্র মানবের দেহচাঞ্চলাকে সবেহেৎভাবে এক করিয়া দেখিয়া আমি একটি মহা সৌন্দযনত্যের আভাস পাইতাম ; বন্ধকে লইয়া বন্ধ হাসিতেছে, শিশকে লইয়া মাতা লালন করিতেছে, একটা গোর আর-একটা গোরর পাশে দাঁড়াইয়া তাহার গা চাটিতেছে, ইহাদের মধ্যে যে-একটি অন্তহীন অপরিমেয়তা আছে তাহাই আমার মনকে বিসময়ের আঘাতে যেন বেদনা দিতে লাগিল। এই সময়ে যে লিখিয়াছিলাম :