পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৬৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


জাপানযাত্রী २७S খসে গেছে। কিন্তু এখনো তার মাটির রঙ ঘোচে নি। পৃথিবীর চেয়ে আকাশের সঙ্গেই যে তার আত্মীয়তা বেশি, সে কথা এখনো প্রকাশ হয় নি— কেবল দেখা গেল, জলে আকাশে এক দিগন্তের মালা বদল করেছে। যে ঢেউ দিয়েছে, নদীর ঢেউয়ের ছন্দের মতো তার ছোটো ছোটো পদবিভাগ নয়; এ যেন মন্দাক্লান্তা, কিন্তু এখনো সমুদ্রের শাদ লবিক্ৰীড়িত শরা হয় নি। পাইলটের হাতে আমাদের ডাঙার চিঠিপত্র সমপণ করে দিয়ে প্রসন্নমনে বসলম। হোলির রাত্রে হিন্দপথানি দরোয়ানদের খচমচির মতো বাতাসের লয়টা ক্ৰমেই দ্রত হয়ে উঠল। জলের উপর সমযাস্তের আলপনা-অাঁকা আসনটি আচ্ছন্ন করে নীলাম্ববরীর-ঘোমটা-পরা সন্ধ্যা এসে বসল। আকাশে তখনো মেঘ নেই, আকাশসমুদ্রের ফেনার মতোই ছায়াপথ জল জল করতে লাগল। ডেকের উপর বিছানা করে যখন শলেম তখন বাতাসে এবং জলে বেশ একটা কবির লড়াই চলছে—এক দিকে সোঁ সোঁ শব্দে তান লাগিয়েছে, আর-এক দিকে ছল ছল শব্দে জবাব দিচ্ছে, কিন্তু ঝড়ের পালা বলে মনে হল না। আকাশের তারাদের সঙ্গে চোখোচোখি করে কখন একসময় চোখ বজে এল। রাত্রে সবগুন দেখলাম, আমি যেন মৃত্যু সম্বন্ধে কোনো-একটি বেদমন্ত্র আবত্তি করে সেইটে কাকে বুঝিয়ে বলছি। আশ্চর্য তার রচনা, যেন একটা বিপলে আতসবরের মতো, অথচ তার মধ্যে মরণের একটা বিরাট বৈরাগ্য আছে । এই মন্ত্রের মাঝখানে জেগে উঠে দেখি, আকাশ এবং জল তখন উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। সমুদ্র চামুণ্ডার মতো ফেনার জিব মেলে প্রচণ্ড অট্টহাস্যে নত্য করছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি, মেঘগলে মরিয়া হয়ে উঠেছে, যেন তাদের কাণ্ডজ্ঞান নেই; বলছে, যা থাকে কপালে। আর, জলে যে বিষম গজনি উঠছে তাতে মনের ভাবনাও যেন শোনা যায় না, এমনি বোধ হতে লাগল। মাল্লারা ছোটো ছোটো লন্ঠন হাতে ব্যস্ত হয়ে এ দিকে ও দিকে চলাচল করছে, কিন্তু নিঃশব্দে। মাঝে মাঝে এঞ্জিনের প্রতি কর্ণধারের সংকেত-ঘণ্টাধানি শোনা যাচ্ছে। এবার বিছানায় শয়ে ঘমোবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু বাইরে জলবাতাসের গজনি আর আমার মনের মধ্যে সেই স্বপ্নলব্ধ মরণমন্ত্র কুমাগত বাজতে লাগল। আমার ঘমের সঙ্গে জাগরণ ঠিক যেন ঐ ঝড় এবং ঢেউয়ের মতোই এলোমেলো মাতামাতি করতে থাকল—ঘমোচ্ছি কি জেগে আছি বঝেতে পারছি নে।