পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৬৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


জাপানযাত্রী २७७ বাঁধা লাইফ-বোট জখম হয়েছে। ডেকে প্যাসেঞ্জারদের একটা ঘর এবং ভাণ্ডারের একটা অংশ ভেঙে পড়েছে। জাপানি মাল্লারা এমন-সকল কাজে প্রবত্ত ছিল যাতে প্রাণসংশয় ছিল। জাহাজ যে বরাবর আসন্ন সংকটের সঙ্গে লড়াই করেছে তার একটা স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেল—জাহাজের ডেকের উপর ককের তৈরি সাঁতার দেবার জামাগলো সাজানো। এক সময়ে এগুলো বের করবার কথা কাপেতনের মনে এসেছিল। কিন্তু ঝড়ের পালার মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট করে আমার মনে পড়ছে জাপানি মাল্লাদের হাসি। শনিবার দিনে আকাশ প্রসন্ন কিন্তু সমুদ্রের আক্ষেপ এখনো ঘোচে নি। আশ্চর্য এই ঝড়ের সময় জাহাজ এমন দোলে নি ঝড়ের পর যেমন তার দোলা। কালকেকার উৎপাতকে কিছুতেই যেন সে ক্ষমা করতে পারছে না, ক্ৰমাগতই ফাঁপিয়ে ফ:পিয়ে উঠছে। শরীরের অবস্থাটাও অনেকটা সেইরকম— ঝড়ের সময় সে একরকম শক্ত ছিল, কিন্তু পরের দিন ভুলতে পারছে না তার উপর দিয়ে ঝড় গিয়েছে। আজ রবিবার। জলের রঙ ফিকে হয়ে উঠেছে। এতদিন পরে আকাশে একটি পাখি দেখতে পেলাম—এই পাখিগলিই পথিবীর বাণী আকাশে বহন করে নিয়ে যায়—আকাশ দেয় তার আলো, পথিবী দেয় তার গান। সমুদ্রের যা-কিছু গান সে কেবল তার নিজের ঢেউয়ের--তার কোলে জীব আছে যথেষ্ট, পথিবীর চেয়ে অনেক বেশি, কিন্তু তাদের কারো কণ্ঠে সদর নেই— সেই অসংখ্য বোবা জীবের হয়ে সমুদ্র নিজেই কথা কচ্ছে। ডাঙার জীবেরা প্রধানত শব্দের দ্বারাই মনের ভাব প্রকাশ করে, জলচরদের ভাষা হচ্ছে গতি । সমদ্র হচ্ছে নত্যলোক, আর পথিবী হচ্ছে শব্দলোক। সমুদ্রের রঙ ২ জ্যৈষ্ঠ। জগতে সৰ্যোদয় ও স্যাসত সামান্য ব্যাপার নয়, তার অভ্যর্থনার জন্যে সবগমতে রাজকীয় সমারোহ। প্রভাতে পথিবী তার ঘোমটা খলে দাঁড়ায়, তার বাণী নানা সরে জেগে ওঠে; সন্ধ্যায় সবগুলোকের যবনিকা উঠে যায়, এবং দ্যলোক আপন জ্যোতি-রোমাঞ্চিত নিঃশব্দতার দ্বারা পথিবীর সম্ভাষণের উত্তর দেয়। সবগমতের এই মুখোমুখি আলাপ যে কত গভীর এবং কত মহীয়ান, এই আকাশ ও সমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তা আমরা বুঝতে পারি। দিগন্ত থেকে দেখতে পাই, মেঘগলো নানা ভঙ্গীতে আকাশে উঠে চলেছে, যেন সন্টিকতার আঙিনার আকার-ফোয়ারার মুখ খালে গেছে। বস্তু প্রায় কিছুই নেই, কেবল আকৃতি, কোনোটার সঙ্গে কোনোটার মিল নেই। যেমন