পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৭৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


জাপানযাত্রী ২৭১ সমাহিত করে দেওয়াই হচ্ছে এই চা-পান-অনুষ্ঠানের তাৎপৰ্য । এর থেকে বোঝা যায়, জাপানের যে সৌন্দর্যবোধ সে তার একটা সাধনা, একটা প্রবল শক্তি। বিলাস জিনিসটা অন্তরে বাহিরে কেবল খরচ করায়, তাতেই দাবল করে। কিন্তু, বিশুদ্ধ সৌন্দর্যবোধ মানষের মনকে বাথ এবং বস্তুর সংঘাত থেকে রক্ষা করে। সেইজন্যেই জাপানির মনে এই সৌন্দৰ্যরসবোধ পৌরষের সঙ্গে মিলিত হতে পেরেছে। জাপানের সৌন্দর্যবোধ একদিন জাপানি নাচ দেখে এলাম। মনে হল, এ যেন দেহভঙ্গীর সংগীত। এই সংগীত আমাদের দেশের বীণার আলাপ | অথাৎ, পদে পদে মীড়। ভঙ্গীবৈচিত্র্যের পরস্পরের মাঝখানে কোনো ফাঁক নেই, কিবা কোথাও জোড়ের চিহ্ন দেখা যায় না; সমস্ত দেহ পাপিত লতার মতো একসঙ্গে দলতে দলতে সৌন্দয্যের পক্ষেপবটি করছে। কিন্তু এদের সংগীতটা, আমার মনে হল, বড়ো বেশি দর এগোয় নি। বোধ হয় চোখ আর কান, এই দইয়ের উৎকর্ষ একসঙ্গে ঘটে না। অসীম যেখানে সীমার মধ্যে সেখানে ছবি। অসীম যেখানে সীমাহীনতায় সেখানে গান। রাপরাজ্যের কলা ছবি, অপরাপরাজ্যের কলা গান। কবিতা উভচর, ছবির মধ্যেও চলে, গানের মধ্যেও ওড়ে। কেননা, কবিতার উপকরণ হচ্ছে ভাষা। ভাষার একটা দিকে অথ", আর-একটা দিকে সরে; এই অর্থের যোগে ছবি গড়ে ওঠে, সরের যোগে গান। জাপানি রপরাজ্যের সমস্ত দখল করেছে। যা-কিছু চোখে পড়ে তার কোথাও জাপানির আলস্য নেই, অনাদর নেই ; তার সবত্রই সে একেবারে পরিপণতার সাধনা করেছে। অন্য দেশে গণী এবং রসিকের মধ্যেই রপরসের যে বোধ দেখতে পাওয়া যায়, এ দেশে সমস্ত জাতের মধ্যে তাই ছড়িয়ে পড়েছে। য়রোপে সবজনীন বিদ্যাশিক্ষা আছে, সবজনীন সৈনিকতার চর্চাও সেখানে অনেক জায়গায় প্রচলিত—কিন্তু এমনতরো সবজনীন রসবোধের সাধনা পথিবীর আর কোথাও নেই। এখানে দেশের সমস্ত লোক সন্দেরের কাছে আত্মসমপণ করেছে। তাতে কি এরা বিলাসী হয়েছে, অকমণ্য হয়েছে। জীবনের কঠিন সমস্যা ভেদ করতে এরা কি উদাসীন কিবা অক্ষম হয়েছে।—ঠিক তার উলটো। এরা এই সৌন্দৰ্যসাধনা থেকেই মিতাচার শিখেছে। এই সৌন্দর্যসাধনা থেকেই এরা বাঁয এবং কমনৈপুণ্য লাভ করেছে।