পাতা:সংকলন (১৯২৬) - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/২৭৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


૨૧ ર সংকলন জাপানি ছবি হারার বাড়িতে টাইক্কানের ছবি যখন প্রথম দেখলাম, আশ্চর্য হয়ে গেলাম। তাতে না আছে বাহুল্য, না আছে শৌখিনতা। তাতে যেমন একটা জোর আছে, তেমনি সংযম। বিষয়টা এই : চীনের একজন প্রাচীন কালের কবি ভাবে-ভোর হয়ে চলেছে—তার পিছনে একজন বালক একটি বীণাযন্ত্র বহন যত্নে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে, তাতে তার নেই; তার পিছনে একটি বাঁকা উইলো গাছ। জাপানে তিনভাগ-ওয়ালা যে খাড়া পদার প্রচলন আছে, সেই রেশমের পদার উপর অাঁকা। মস্ত পদা এবং প্রকান্ড ছবি। প্রত্যেক রেখা প্রাণে ভরা। এর মধ্যে ছোটোখাটো কিবা জবড়জং কিছুই নেই—যেমন উদার, তেমনি গভীর, তেমনি আয়াসহীন। নৈপুণ্যের কথা একেবারে মনেই হয় না—নানা রঙ, নানা রেখার সমাবেশ নেই—দেখবামাত্র মনে হয়, খবে বড়ো এবং খুব সত্য। তার পরে তাঁর ভূদশ্য-চিত্র দেখলাম। একটি ছবি—পটের উচ্চপ্রান্তে একখানি পণচাঁদ, মাঝখানে একটি নৌকা, নীচের প্রান্তে দটো দেওদার গাছের ডাল দেখা যাচ্ছে; আর কিছ না, জলের কোনো রেখা পর্যন্ত নেই। জ্যোংনার আলোয় সিথর জল কেবলমাত্র বিস্তীর্ণ শত্রতা—এটা-যে জল, সে কেবলমাত্র ঐ নৌকাটি আছে বলেই বোঝা যাচ্ছে; আর এই সব ব্যাপী বিপলে জ্যোৎসনাকে ফলিয়ে তোলবার জন্যে যত-কিছু কালিমা, সে কেবলি ঐ দটো পাইন গাছের ডালে। ওস্তাদ এমন একটা জিনিসকে অকিতে চেয়েছেন যার রপে নেই, যা বহৎ এবং নিস্তব্ধ—জ্যোৎসনারাত্ৰি—অতলসপশ* তার নিঃশব্দতা। কিন্তু, আমি যদি তাঁর সব ছবির বিস্তারিত বর্ণনা করতে যাই, তা হলে আমার কাগজও ফরোবে, সময়েও কুলোবে না। হারা-সান সবশেষে নিয়ে গেলেন একটি লম্ববা সংকীর্ণ ঘরে, সেখানে এক দিকে প্রায় সমস্ত দেয়াল জুড়ে একটি খাড়া পদা দাঁড়িয়ে। এই পদায় শিমোমরার অীকা একটি প্রকাণ্ড ছবি। শীতের পরে প্রথম বসন্ত এসেছে—গলাম গাছের ডালে একটিও পাতা নেই, সাদা সাদা ফল ধরেছে, ফলের পাপড়ি ঝরে ঝরে পড়ছে: বহৎ পদার এক প্রান্তে দিগন্তের কাছে রক্তবর্ণ সত্য দেখা দিয়েছে, পদার অপর প্রান্তে লামগাছের রিক্ত ডালের আড়ালে দেখা যাচ্ছে একটি অন্ধ হাতজোড় করে সর্যের বন্দনায় রত। একটি অন্ধ, এক গাছ, এক সন্য’, আর সোনায়-ঢালা এক সবেহৎ আকাশ; এমন ছবি আমি কখনো দেখি নি। উপনিষদের সেই প্রাথনাবাণী যেন রােপ ধরে আমার কাছে দেখা দিলে—তমসো মা জ্যোতিগময়। কেবল অন্ধ মানষের নয়, অন্ধ প্রকৃতির এই প্রার্থনা তমসো মা জ্যোতিগময় সেই লামগাছের একাগ্র-প্রসারিত শাখা ।