পাতা:সময় অসময় নিঃসময় - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/১২০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও ভাবাদর্শ

 ‘শিল্পীকে কী ভাব তোমরা? নিছক জরদগব—যদি চিত্রকর হয়, শুধু চোখ আছে? যদি গাইয়ে হয় শুধু কান কিংবা যদি কবি হয়, তাহলে মনের প্রতিটি স্তরে একটা বীণা? কিংবা ধরো, মুষ্টিযোদ্ধা হলে নেহাত কিছু পেশি? একেবারে উল্টো। একই সঙ্গে শিল্পী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব-হৃদয় বিদারক, উত্তেজক বা সুখপ্রদ ঘটনার প্রতি যে সবসময় সজাগ—সমস্ত রকম ভাবে সে এদের ডাকে সাড়া দেয়। এটা কী করে সম্ভব যে অন্য কোনো মানুষ সম্পর্কে সে কোনো আগ্রহ বোধ করবে না? জীবনকে যে এত আন্তরিকতা দিয়ে তোমাদের সামনে তুলে ধরছে—কী করেই বা সে জীবন থেকে নিজেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখবে? না, ঘর সাজানোর জন্যে ছবি আঁকা হয় না। শত্রুকে আক্রমণ করার জন্যে বা শত্রুর কবল থেকে আত্মরক্ষার জন্যে ছবি আসলে যুদ্ধের হাতিয়ার।’

 এই অসামান্য কথাগুলি যাঁর, তিনি বিশ শতকের কিংবদন্তি শিল্পী পাবলো পিকাসো। ১৯৩৭-এর ২৬ এপ্রিল জেনারেল ফ্রাঙ্কোর নির্দেশে জার্মান বিমান বাহিনী স্পেনের ছোট্ট শহর গুয়ের্নিকার উপর নির্বিচারে বোমা বর্ষণ করে তাকে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলেছিল। আর, এর ঠিক ছদিন পরে পিকাসোতার বিশ্ববিখ্যাত মুরালের কাজ আরম্ভ করেন। বোমাবিধ্বস্ত গুয়ের্নিকার নামে ছবিটির নাম রাখেন তিনি। এতে প্রমাণিত হয়েছিল, মানুষের সপক্ষে ও অন্ধকারের অপশক্তির বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করাই শিল্পীর প্রধানতম দায়িত্ব। একুশ শতকের প্রথম বছরে আফগানিস্থানের সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, শিশুদের পাঠশালা যখন শক্তি-দম্ভে উন্মাদ মার্কিন বোমায় ও ক্ষেপণাস্ত্রে ধ্বংস হয়ে গেল—পিকাসোর উত্তরাধিকারীরা কোথায় ছিলেন? তবে কি চৈতন্য পুরোপুরি অসাড় হয়ে গেছে আমাদের?

 এই আর্ত প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছে কয়েক বছর ধরে। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও ভিন্ন মতবাদের অধিকারকে নির্মম তাচ্ছিল্যে অস্বীকার করে ইঙ্গ-মার্কিন সমরশক্তি যখন ইরাকের জনপদের পরে জনপদ জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাক করে দেয়-বেয়নেটের বিরুদ্ধে ফুল ও পায়রা ছুঁড়ে দেওয়ার মতো কোনও সংস্কৃতি-কর্মী কি থাকে না কোথাও?

 এই জিজ্ঞাসা থেকে ফিরে যেতে হয় মৌলিক আদি-প্রশ্নে:সংস্কৃতিকি? সাংস্কৃতিক আন্দোলন কেন, কাদের জন্যে? এতে ভাবাদর্শের গুরুত্ব কোথায়? না, এ আদপেই কোনও তাত্ত্বিক প্রশ্ন নয়, অত্যন্ত জরুরি প্রায়োগিক বাস্তবের বিষয়। কিছুদিন থেকেই বেশ কিছু কথা মনে কাটার মতো বিধছে। আমাদের এই প্রান্তিক বরাক উপত্যকায় যেমন, তেমনই উদ্ভাসিত কোনও অঞ্চলেও যাঁরা গানে-নাচে-নাটকে অত্যন্ত জোরালো ভাবে প্রগতিশীল মর্মবস্তুর পোষকতা করেন, তাঁদেরই কেউ কেউ ব্যক্তিগত

১১৬