পাতা:সময় অসময় নিঃসময় - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/২৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

নিভন্ত এ চুল্লিতে সই একটু আগুন দে

 ব্রহ্মাণ্ড পুড়ছে। ইতিহাস পুড়ছে। সভ্যতা পুড়ছে। সংস্কৃতি পুড়ছে। দাউ দাউ আগুনে ছাই হয়ে যাচ্ছে এতদিনকার সমস্ত উপার্জন। সব কিছু ইন্ধন এখন। আসলে সময় নিজেই দাহ্য, নিজেই দাহক। পরিণাম বলে কিছুই নেই। পরিণাম এক বিভ্রম মাত্র, পরিণাম এক প্রহসন। ধারালো কুয়াশা ছেয়ে ফেলেছে চরাচর। তাই যারা অন্ধ, সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা। ইতিহাসের মৃত্যুর কথা বলে, সংস্কৃতির মৃত্যুর কথা বলে, মতাদর্শের মৃত্যুর কথা বলে, মানুষের মৃত্যুর কথা বলে। মুখ নয় শুধু, গোটা অবয়ব ঢেকে যাচ্ছে আঁচক্ বিজ্ঞাপনে। মুখ নয় শুধু, মায়াবী আরশিতে চলে। মুখোসের দেখাদেখি। জানাশোনা নয়, স্রেফ তাকিয়ে থাকা। কারণ, জানারও মৃত্যু হয়ে গেছে। মানুষ যে-দুনিয়ায় অস্তিত্বকেও প্রত্নতত্ত্বের বিষয় করে তোলে—সেখানে নির্দিষ্ট অবস্থান বলে কিছু থাকতে পারে না। সিচ্যুয়েশন নেই, নেই সিচ্যুয়েটেনেস। অতএব নেই সত্য-মিথ্যা, আলো-অন্ধকারের দ্বৈততা।

 তাহলে, এখন প্রত্যাশাও নেই কোথাও। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া কেবল জরাজীর্ণ অভ্যাসের প্রাতিষ্ঠানিকতা। লক্ষ্য নেই কিছু, যাত্রাও নেই কোথাও। আসছে-আসছে ভাবতে-ভাবতে হৈ হৈ করে নয়, গড়াতে-গড়াতে চলে এল এবং গেল ধাঁধাছড়াননা ২০০০ সাল। নতুন অ্যালিসেরা সব চলেছে ওয়াণ্ডারল্যাণ্ডে, আয়নার বাইরে থেকে আয়নার ভেতরে। বাস্তব ধুলোমাটি ঢাকা রইল পেছনে। এখন থেকে সবই কুহকের বাস্তবতা। ত্রৈলোক্যনাথের কঙ্কাবতীর মতো ঘোরের ভেতরে চলে যাব সবাই। যা আছে সমস্ত বোহেঁসের লেবিরিনথ: স্তরের পর স্তর, সিঁড়ির পরে সিড়ি। বাস্তব থেকে ছুটি নিয়ে কুহকের গোলকধাঁধায় মিশে যাব। সামনে আছে ইশারা অবিরত: ক্লোনিং, কসমেটিক সার্জারি, সেক্স-ডল, ডেনিম-রেমণ্ড-পিটার ইংল্যাণ্ড দিয়ে মোড়া আর প্রায়-নগ্ন লাস্যময়ী তরুণী পরিবৃত সম্পূর্ণ মানুষের নতুন আধুনিকোত্তর চিহ্নায়ক, শৌর্য ও সাফল্যের নব্য চিহ্নায়ন প্রকরণের প্লাবন। এ এক বিকল্প জীবনের পাঠ। এই পাঠের জন্যে আমাদের তৈরি করে নিচ্ছে বহুজাতিক সংস্থাগুলি যাদের দাপটে অতি দ্রুত মুছে যাচ্ছে রাষ্ট্র। সার্বভৌমত্ব, স্বাতন্ত্র্য, স্বাধীনতা ইতোমধ্যে প্রত্নতত্ত্বের বিষয় হয়ে পড়েছে।

 ‘বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছ, কেমনে দিই ফাঁকি/আধেক ধরা পড়েছি গো, আধেক আছে বাকি’—এ গানের আদি তাৎপর্য যা-ই থাকুক, এখন তা নয়া উপনিবেশবাদের জালে মাছির মতো বন্দী ভারতরাষ্ট্রের মর্মগাথা। হয়তো এ ভাষাও অতীতের ভাষা।

২৪