পাতা:সময় অসময় নিঃসময় - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৬১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।


শহিদের স্মৃতিচারণকে বলে ‘টিপিক্যাল সেন্টিমেন্টালিটি'। আত্মবিস্মৃত উত্তর-প্রজন্ম এইমাত্র জানে যে উনিশে মে শিলচর রেল স্টেশনে গুলি চলেছিল। মারা গিয়েছিল এগারোজন যাদের বছর-বছর ভাষা-শহিদ বলে প্রচার করা হয়। মোড়ে মোড়ে ধূসর ফটোতে মালা চড়ানো হয়, কয়েক ঘন্টার জন্যে তৈরি বেদিতে ধূপকাঠি জ্বলে। গান-বক্তৃতা-কবিতা হয় এদিক-ওদিক। গত ক’বছর ধরে ক্যাসেট বেরোচ্ছে, পুস্তিকা বেরোচ্ছে। খবরের কাগজের কলমচিদের সেদিন অন্তত বিষয় খুঁজতে হয় না। বছরের বাকি তিনশ চৌষট্টি দিন যত রবি জ্বলুক না, আঁখি মেলে তাকায় না কেউ। পিঠ পুড়তে থাকলে শুধুমাত্র ফিরে শোওয়ার কষ্টটুকু স্বীকার করে। কিন্তু উত্তর-প্রজন্মের কথাই বা লিখছি কেন, আম-জনতার কাছেও বাংলা নামে দেশের উত্থান কোনো তাৎপর্য নিয়ে আসেনি। ধর্মীয় কূপমণ্ডুকতার বন্দীশালা ভেঙে বাঙালি জাতি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষায় উত্তরণ ঘটেনি। কালের যাত্রার ধ্বনি শুনতে পাননি কেউ। আপাত-সময়ের রঙিন মুখোশে মুগ্ধ ও বিভ্রান্ত প্রায় সবাই, বিশেষত বিজ্ঞ বুদ্ধিজীবীরা চূড়ান্ত আত্মপ্রতারক এবং কস্তুরীমৃগের মতো আপনার গন্ধে আপনি বিভোর। প্রকৃত সময়ের গভীর সংবেদনায় প্রাণিত হতে এখনও অনেক বাকি।

 মেকি নাগরিকতার দর্পে আচ্ছন্ন মধ্যবিত্ত বর্গের একটা বড়ো অংশের কাছে ভাষা-সংগ্রামের পরম্পরা কোনও তাৎপর্য বয়ে আনে না। উপভাষাগত পরিচয় কিছু কিছু শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। বাঙালি হয়ে ওঠার চেয়ে নো ম্যানস্‌ ল্যাণ্ডে দাঁড়ানো দোআঁশলা অস্তিত্ব হয়ে ওঠা বরং অনেক সহজ। এরা ছেলে-মেয়েদের ইংরেজি-মাধ্যম স্কুলে পড়ান এবং পরে ব্যাঙ্গালোর-হায়দ্রাবাদ কিংবা অন্য কোথাও পাঠিয়ে ডলারের স্বর্গরাজ্যে পাড়ি দেওয়ার পাসপোর্ট সংগ্রহ করার স্বপ্ন দেখেন। ভাষা-সংস্কৃতি চেতনা নিয়ে এরা কিছুমাত্র চিন্তিত নন বলে অসমিয়াকরণ বা হিন্দিকরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে এদের কোনও বক্তব্য থাকে না। ফলে বিচিত্র স্ববিরোধিতায় আক্রান্ত এখনকার বাঙালি সমাজ।

 এর একটা বড়ো কারণ সম্ভবত এই যে বঙ্গীয় রেনেসাঁসের তরঙ্গাভিঘাত থেকে দুটো চারটে ছোট ঢেউও এখানে পৌছায়নি। ভাষিক চেতনা বিকশিত হতে পারত। শিক্ষাপ্রসারের আন্দোলন এবং তার সহযোগী দীপায়ন ও সমাজ-সংস্কারমূলক আন্দোলন পরিচালিত হলো। এখানকার মধ্যবিত্ত বর্গের বিলম্বিত বিকাশ এবং নগরায়নের অতিধীর লয়ে গ্রাম-শহরের বিভাজনকে মনস্তাত্ত্বিক স্তরে জগদ্দল পাথর করে তুলছে। তার ওপর মধ্যবিত্ত বর্গের উৎসগত চরিত্র অর্থাৎ উচ্চবর্ণীয় হিন্দু হিসেবে তাদের পরিচিতি এবং শিলচর-করিমগঞ্জের নাগরিক সমাজে তাদের উজ্জ্বল অবস্থান নিম্নবর্গীয় গ্রামীন হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ক্রমাগত বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। কৃষিভিত্তিক সামন্ত সমাজের স্বাভাবিক স্থবিরতার সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কূপমণ্ডুকতা যুক্ত হওয়ার ফলে ওই বিরূপতা ভুলভাবে সাম্প্রদায়িক চেহারা নিয়েছে। কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনে

৫৭