পাতা:সময় অসময় নিঃসময় - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৬২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।


ব্যবহৃত নিজস্ব বিভাষার গোত্র-পরিচয় জানার কোনও আকাঙ্ক্ষা না থাকাতে সংঘবদ্ধ হীনমন্যতা স্বতঃসিদ্ধ ভাবে আত্ম-নিরাকরণে পরিণত হয়েছে।

 এই আত্ম-অস্বীকৃতির ফলেই বাংলা ভাষা হয়ে পড়ছে দূরবর্তী কোনও নক্ষত্রের মতো ঝাপসা। নিশ্চেতন মন সবচেয়ে আগে উপনিবেশের দখলে যায়, তা বাইরের হোক কিংবা ভেতরের। বরাক উপত্যকার অন্তেবাসী গ্রামীন হিন্দু-মুসলমান এর সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ। এদের মধ্যে মধ্যবিত্ত বর্গের অনুপস্থিতি এবং ধর্মীয় কুহকের নির্বাধ বিস্তার নিজেদের বাঙালি বলে চিনতে দেয়নি। এছাড়া আরো একটা গুরুতর কথাও আছে। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় নাড়া বাঁধা বলে ভাষিক সম্প্রসারণবাদ ও অভ্যন্তরীন উপনিবেশবাদের সহজ শিকার বরাক উপত্যকা। একটু আগে বিভাষাগত পরিচয়ে যে-বিভ্রান্তির কথা বলেছি, তা এখানকার আধা-ঔপনিবেশিক পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই। সহজ পথে কিছুই এখানে অর্জনীয় নয় বলে সব কিছু বাঁকা পথে চলে। উপনিবেশীকৃত মনে কোনও প্রতিরোধ থাকে না। তাই শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত নির্বিশেষে একই নিয়ম প্রযোজ্য এখানে। ভাষা-সংগ্রামের উত্তাপ যত বেশি স্তিমিত হয়ে আসছে, আত্মসমর্পণের প্রবণতা বাড়ছে তত। যাদের কাছে বরাকভূমি সহজ মৃগয়াক্ষেত্র, তারা কিছু কিছু মধ্যস্বত্ব-ভোগীদের তৈরি করেছে। এরাই ভাষা-চেতনার হননকারী। চতুর হিসেব কষে এরা উসকে দেয় সাম্প্রদায়িক অপচেতনাকে, অন্ধতাকে নিরঙ্কুশ করে রাখে নানা অজুহাতে এবং এরাই মূঢ়তাকে সম্বল করে। এরাই সাপ হয়ে ছোবল দেয় এবং ওঝা হয়ে বিষ ঝাড়তে আসে। এরাই বরাক উপত্যকার জনজীবনে বহুস্বরসঙ্গতির প্রবণতাকে নষ্ট করতে চায়। বাংলার বিভাষাকে অসমিয়ার গাঁটছড়ায় বাঁধতে চায়। কেননা এতেই আধা-ঔপনিবেশিক রাজনীতি-অর্থব্যবস্থা-অপসংস্কৃতির পুষ্টি। এইসব মধ্যস্বত্বভোগীরা স্থানীয় মোড়ল কিন্তু আসলে রাজ্যিক কেন্দ্র ও দিল্লির মসনদের প্রতাপযন্ত্রের সেবক। এদের থাবার নিচে লুকোনো বাঘনখ সহজে চোখে পড়ে না। সাধারণ মানুষের।

 তাই ভাষা-সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের চেতনাকে জারি রাখার কঠিন লড়াই সামনে: এই বার্তা প্রতিবার নিয়ে আসছে উনিশে মে। নিশ্চয় মুখ্যত বরাক উপত্যকার আত্মবিস্মৃত বাঙালিদের জন্যে, কিন্তু গৌনত কি পশ্চিমবঙ্গের বঙ্গভাষীদের জন্যেও নয়? এটাও ঠিক, বরাক উপত্যকাতেই শিশুপাঠ্য বইগুলিতে অবাধে চলছে বাংলা ভাষার বিদূষণ। অসমিয়া শব্দ ও বাক্যবদ্ধ ইচ্ছে করে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে যাতে চেতনাকে বাঁধতে পারে সহস্র শৈবালদল। বরাক উপত্যকার বাঙালিদের ঘরে শত্রু বাইরে শক্র, জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমের দৌলতে মগজে ধোলাইয়ের আয়োজন নির্বাধ, এব্যাপারে দিল্লি-ওয়াশিংটন একজোট। মুছে যাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ-সত্যজিৎ-ঋত্বিক। শৈশব থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন সুকুমার রায়-উপেন্দ্রকিশোর-শিবরাম। কে আর খবর রাখে বিভূতিভূষণ-তারাশংকর-মানিকের কথনবিশ্ব কীভাবে জীবনের জয় ঘোষণা করে, কীভাবে ওয়ালীউল্লাহ-হাসান আজিজুল হক-আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-শামসুর রাহমান-মোহাম্মদ রফিক অবিভাজ্য বাঙালি

৫৮