পাতা:সময় অসময় নিঃসময় - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৮৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

বাংলা ভাষার বিপন্নতা

 কেন এই শিরোনাম? একুশ শতকের গোড়ায় কি এমন কিছু নতুন ও জটিল সমস্যা তৈরি হয়েছে যে এবিষয়ে আরও একটি প্রতিবেদন জরুরি হয়ে পড়েছে। বিপন্নতা কি আলাদা ভাবে বাংলা অথবা যে-কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল-ভিত্তিক ভাষার অথবা বাঙালি জাতির? আরও একটি গোড়ার প্রশ্ন এসে যায়: বিপন্নতা কী এবং কেন! প্রতীত বাস্তবতা (Virtual reality)-র পর্যায়ে চিহ্নায়নের সন্ত্রাস যখন কার্যত নিশ্চিহ্নায়নের তোড়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে সব কিছু, একাকার হয়ে যাচ্ছে প্রাগ্রসর ও অতি-পশ্চাৎপর সামাজিক ও ভৌগোলিক পরিসর—সংযোগের প্রয়োজন ও তাৎপর্য পুরোপুরি উন্মুল হয়ে পড়ছে। তাহলে সংযোগের সবচেয়ে মৌলিক মাধ্যম ভাষায় কি অবান্তর হয়ে পড়ছে ভাষার সন্ততি চিহ্নের উদ্ধত আধিপত্যে? বিশ্ব জুড়ে অন্তর্জাল এখন বৈদ্যুতিন ইশারায় সংবাদ বিনিময়ে অভ্যস্ত করে তুলছে আমাদের। অকল্পনীয় দ্রুত গতিতে, কার্যত মুহূর্তের মধ্যে, সূচিমুখ জ্ঞাতব্য পৌছে দিচ্ছে যে-কোনো প্রান্তে। মেদহীন ভারহীন শাখা-প্রশাখাহীন তথ্যের বুদ্বুদ উন্মীলিত ও নিমীলিত হচ্ছে মুহূর্মুহ্। বাংলা ভাষা যারা ব্যবহার করেন, বিশ্বায়নের এই সাম্প্রতিকতম অভিঘাত বিপুল ও অভূতপূর্ব প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে তাদের ভাষা-চেতনায় অর্থাৎ বাচনিক লক্ষ্য- আধারআধেয়-কৃৎকৌশল-পরিধি-সম্ভাব্য বিচ্ছুরণ সম্পর্কিত ধারণায়। বিপন্নতা তৈরি হচ্ছে এইসব অনুষঙ্গে।

 এই পৃথিবীতে ছাব্বিশ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। বাংলাদেশ, পশ্চিমবাংলা, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, ঝাড়খণ্ড, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, দিল্লী, আন্দামান এবং ইংল্যান্ডে আমেরিকায় এঁদের বসবাস। স্বভাবত বাঙালি জাতিসত্তা সম্পর্কে সবাই সচেতন নন, কেউ কেউ আবার পুরোপুরি অনবহিত ইদানীং। তবু চান বা না চান, ভাষার মধ্য দিয়ে বহমান ঐতিহ্য এঁদের সবাইকে ঋদ্ধ করে। নিদালির ঘোরের মধ্যে সোনার কাঠির স্পর্শ যোগান দেয়। ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তম ও সমৃদ্ধতম জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও বাঙালি কেন জাতিসত্তার সম্ভাবনা সম্পর্কে উদাসীন এবং তার ভাষাচেতনা কেন কখনও কখনও আঁধিতে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে: এই প্রশ্ন মীমাংসা দাবি করে। ভারত রাষ্ট্রের লাগাম যাদেরই হাতের মুঠোয় থাকুক না কেন, হিন্দুত্ববাদী ভারতীয়দের প্রবক্তারা উপনিবেশ কায়েম রাখতে চায় বাঙালির মনে এবং সুকৌশলে তাদের ভাষা-চেতনায় বেনোজল ঢুকিয়ে বিদূষণে অভ্যস্ত করে ফেলে। এর উৎকট দোসর ভাষিক সম্প্রসারণবাদ আসামে অসমিয়াকরণের মধ্যে কীভাবে সক্রিয়, তার খবর অনেকেই রাখেন না। গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের অধিকার থেকে বঞ্চিত আসামের বাঙালিরা। সরকারি মদতে বেপরোয়া আঞ্চলিক প্রভুত্ববাদীরা আসামের বহু ঐতিহ্যসম্পন্ন বাংলা-মাধ্যম বিদ্যালয়কে অসমিয়া-মাধ্যম বিদ্যালয়ে

৭৯